সাভারের রানা প্ল¬াজার দূর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের জন্য আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার সভাপতি হযরতুলহাজ্ব শাহ্ সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী মাইজভান্ডারী (মাঃজিঃ আঃ) এর গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন।

সাভারের রানা প্ল¬াজার দূর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের জন্য আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার সভাপতি হযরতুলহাজ্ব শাহ্ সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী মাইজভান্ডারী (মাঃজিঃ আঃ) এর গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন।

উপমহাদেশের আধ্যাতিœক চর্চ্চার প্রানকেন্দ্র দরবার-এ গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর বর্তমান সাজ্জাদানশীন ও আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার সভাপতি আওলাদে রাসুল (দঃ) হযরতুলহাজ্ব শাহ্ সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী মাইজভান্ডারী (মাঃজিঃ আঃ) নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সাভারের রানা প্ল¬াজার দূর্ঘটনায় আহতদের দেখতে ২৬ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি আহতদের সান্তনা দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন। তিনি নিহতদের প্রতি গভীর শোক ও আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন।

তিনি আনজুমানের সকল সদস্যকে এই দুর্যোগ মোকাবেলায় রক্তদান সহ সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদানের আহব্বান জানান। পাশাপাশি এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী সকলকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহব্বান জানান। প্রতিনিধি দলে অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা রুহুল আমিন ভূঁইয় চাদপুরী, শাহ্ এস এম আকতারুজ্জামান মাইজভান্ডারী, আলহাজ্ব গাজী মোঃ সালাহউদ্দিন, মোঃ ফরিদউদ্দীন আহমদ, খলিফা এম ওসমান আলী ও মোঃ শরীফুর রহমান।

Posted in Uncategorized | Comments Off on সাভারের রানা প্ল¬াজার দূর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের জন্য আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার সভাপতি হযরতুলহাজ্ব শাহ্ সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী মাইজভান্ডারী (মাঃজিঃ আঃ) এর গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন।

হযরত গাউছুল আযম বাবাভাণ্ডারী মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান (ক.) মানব কল্যাণের পথিকৃৎ শাহ্জাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী

হযরত গাউছুল আযম বাবাভাণ্ডারী মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান (ক.) মানব কল্যাণের পথিকৃৎ-
শাহ্জাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী
সাজ্জাদানশীন দরবার-এ-গাউছুল আযম মাইজভাণ্ডারী,
মাইজভাণ্ডার শরীফ, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।

আল্লাহ্পাক যুগে যুগে মানুষকে কল্যাণ ও মুক্তির পথে আনয়ন করে দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি প্রদানের জন্য নবী, রাসূল, গাউছ-কুতুব, অলী-আবদালগণকে জগতের বুকে প্রেরণ করেছেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর পর নুবূওয়াতের দ্বার চিররুদ্ধ হয়ে গেলেও হিদায়তের দ্বার চির অব্যাহত রয়েছে আল্লাহর অলীদের মাধ্যমে।
আধ্যাত্মবাদ তথা সূফিজম ইসলামের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। সূফিতত্ত্বহীন ইসলাম প্রায়ই মানুষকে অকল্যাণের দিকে ধাবিত করে। ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। আর এর বাস্তবায়নতা নির্ভর করে আধ্যাত্মবাদ তথা সূফিজমের উপর। আল্লাহ্ পাক এরশাদ ফরমান ঃ “লিকুল্লিন যায়াল্না মিনকুম শিরয়াতান ওয়া মিন্হাযা” অর্থাৎ- আমি (আল্লাহ্) তোমাদের সকলের জন্য একটি সাধারণ পথ (শরীয়ত) এবং অপরটি মিনহাজ বা নিগুঢ় তত্ত্বের পথ (মা’রফত) সৃষ্টি করেছি। শেষোক্ত পথটিই হলো আধ্যাত্মবাদ।
নিগুঢ়তত্বের অনুশীলন ব্যতিরেকে মানবতার উৎকর্ষতা সাধন সম্ভব নয়। বাহ্যতঃ বহু জ্ঞানের অধিকারী ব্যাক্তিকেও মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হলো সে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধির জন্য কোন অনুশীলনই করেনি। এ অনুশীলন শুধুমাত্র অলী আল্লাহদের দরবারেই হয়ে থাকে। আল্লাহ্ বলেনঃ “ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহা” অর্থাৎ- যার আত্মা পরিশুদ্ধ হয়েছে সে সফলকাম হয়েছে। স্মর্তব্য যে, সূফী তত্ত্বের সম্পর্ক হলো আত্মার সঙ্গে, আত্মা সঠিক থাকলে অন্য সবকিছুই ঠিক থাকে। আর আত্মা বিনষ্ট হলে সব কিছুই বিনষ্ট হয়।
ত্বরীকায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার পূর্ণতা দানকারী, হযরত গাউছুল আযম বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.) গাউছিয়তের সুমহান প্রদীপ হাতে জগতকে উজালা করে অমানবতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা, বিদ্বেষ দূরিভূত পূর্বক ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করেছেন। সারা বিশ্বে মানবতার সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করে তিনি শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন। ফলে বর্তমান বিবদমান পরিস্থিতিতেও কোন মাইজভাণ্ডারীর গায়ে সন্ত্রাস-জঙ্গী নামক কলংকের দাগ লাগেনি। তাই ত্বরীক্বায়ে মাইজভাণ্ডারীয়া সারা বিশ্বে এক সুমহান অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী ত্বরীক্বা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।
আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে এরশাদ ফরমান ঃ “ওয়া আছবাগা আলাইকুম নেয়্মাহু জাহিরাতান ওয়া বাতিনাতান” অর্থাৎ- এবং (আল্লাহ্) তোমাদেরকে পূর্ণ মাত্রায় দান করেছেন আপন অনুগ্রহ সমূহ, প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে।
বাহ্যিক নেয়ামত বা কল্যাণসমূহ চর্মচোখে দেখা যায়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ নেয়ামতসমূহ আল্লাহ্পাক তাঁর নবী-রাসূল, ওলী-আউলিয়া, সূফী-দরবেশ প্রিয় ভাজনদের মাধ্যমে বিতরণ করেন; যা প্রায়ই বান্দার অনুভূতিতে আসেনা। আল্লাহ্পাক এরশাদ ফরমানঃ “ইন্না রাহমাতাল্লাহে ক্বরীবুম মিনাল মুহছিনীন” অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহ্র অনুগ্রহ আল্লাহ্র প্রিয় ভাজনদের নিকট বিদ্যমান।
‘মানবতা’ শব্দটি কোন বিশেষ জাতি, বংশ, গোত্র, ধর্ম, বর্ণ এর জন্য ব্যবহৃত হয়না বরং এটি সার্বজনীন। আল্লাহ্ পাক স্বয়ং অসাম্প্রদায়িক ও বিশ্ব মানবতার কল্যাণকামী। এই নীতি আদর্শ নবী, রাসূল ও অলী আল্লাহ্দের মধ্যে বিদ্যমান। যারা এর বিরুদ্ধাচারণ করে তারা বাস্তবে আল্লাহ্র গুণে গুণান্বিত হতে পারেনা। তাদের ধর্মীয় জ্ঞান মানবতার কোন কল্যাণেই আসেনা বরং মানবতাকে অনেক সময়ই ভুলণ্ঠিত করে।
গাউছুল আযম হযরত বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.) মানবতার প্রভূত কল্যাণে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণভাবে এ পৃথিবীতে অগণিত নিদর্শন রেখে গেছেন। একদিকে তিনি তাঁর দরবারকে অবারিতভাবে সর্ব জাতি ও সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে তাঁর পবিত্র পরশে সকলকে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ফলে পথহারা, মোহান্ধ ও মানবতা বিরোধী গোষ্ঠীসহ সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলীর অসাধারণ বিকাশ ঘটে ও এই আদর্শ ভারতীয় উপমহাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সর্বশ্রেণীর মানুষের ভিতর সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ভাব গড়ে উঠে। ফলে হানা-হানি, সংঘর্ষ ও রক্তপাত থেকে বিরাট সংখ্যক মানুষ নিরাপদ থাকে। মানবতার জন্য বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.)’র এই অবদান বিশ্ব মানবতা চিরদিন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখবে। অদ্যাবধিও মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.)’র এই সুমহান আদর্শ বিদ্যমান রয়েছে। তাইতো দেখা যায় মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ লাখো লাখো হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, গারো, হাজং, শাওতাল, ঝুমিয়া প্রভৃতি জাতির মহামিলনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। আবহমান কাল ধরে দেশ-বিদেশের বহু পীর-মশায়েখ, ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবি, রাজনীতিবিদদের পদচারণায় নিত্য মুখরিত বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.) এর রওজা শরীফ চত্বর।
অপরদিকে তাঁর বেলায়েতে উজমার ক্ষমতাবলে সমগ্র সৃষ্টির প্রতি অস্বাভাবিক মেহেরবাণী করেছেন তিনি। এই মহামানব তাঁর বেলায়েতি ক্ষমতায় অনেক সাধারণ মানুষকে অলীতে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর হাতের লাঠির প্রহারে, তাঁর ব্যবহার্য বদনার আঘাতে, কদমের চাপে, পবিত্র পদ-যুগলের আঘাতে অথবা তাঁর থুতু মোবারকের বরকতে হাজার হাজার মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়েছে। তিনি হুজরা শরীফে অবস্থান কালে জলপাত্র দ্বারা তাঁর প্রসারিত ডান হস্ত মুবারকে অবিরত পানি ঢালার রেওয়াজ ছিল, হস্ত বিধৌত জল রোগমুক্তি, প্রাণ সঞ্চারসহ বহুবিধ মানবতার কল্যাণে ব্যবহৃত হতো। বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.)’র নিকট থেকে অসংখ্য কেরামত প্রকাশ পেয়েছে। তন্মধ্যে মানব কল্যাণধর্মী কয়েকটি কেরামত যেমন ঃ মস্তিষ্ক বিকৃত বোবা ছেলেকে প্রহার পূর্বক বাকশক্তি ফিরিয়ে দেয়া, তাঁর কৃপাদৃষ্টিতে হতাশাগ্রস্ত ব্যাক্তির পুত্র সন্তান লাভ, স্বপ্নযোগে সতর্ক করার মাধ্যমে ভক্তকে অত্যাসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করে নিরাপত্তা প্রদান, আক্রমনকারীদের লাঠির আঘাত তাদের নিজেদের গায়ে লাগিয়ে আক্রমন থেকে ভক্তকে উদ্ধার। বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.) নামের উছিলা নেওয়ার সাথে সাথে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে ভক্তের দোকান রক্ষা পাওয়া, রওজা শরীফের জল পান পূর্বক চিকিৎসায় বিফল মহিলার রক্তক্ষরন বন্ধ হওয়া, স্বপ্নযোগে হাত বুলিয়ে দুরারোগ্য রুগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দেয়া ছাড়াও তিনি রূহানীভাবে অদৃশ্য জগত থেকে মানুষকে সাহায্য করার অসংখ্য প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে ।
তাঁর এ ধারাবাহিকতা নিরবিচ্ছিন্ন ও সম্প্রসারিত করার মানসে মানব কল্যাণধর্মী এ ত্বরীক্বার আদর্শ আল্লাহ্ প্রাপ্তির সহজ পদ্ধতিকে আরো আধুনিক যুগোপযোগী চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন বাবাভাণ্ডারী কেবলা (ক.ছি.আ.)’র যোগ্যতম উত্তরসূরী পৌত্র, ৩০তম আওলাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম, শায়খুল ইসলাম, ইমামে আহলে সুন্নাত, গাউছুল ওয়ারা হযরতুল্হাজ্ব মাওলানা শাহ্সূফী সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী ওয়াল হোসাইনী আল্-মাইজভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.)। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সর্ব ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের মাঝে পৌরহিত্য পূর্বক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান এবং সেখানে মীলাদ মাহফিল পরিচালনার মাধ্যমে তিনি শুধু মাইজভাণ্ডারী আধ্যাত্ম পরিমন্ডলে নয় বরং সমগ্র বাংলাদেশ ও জাতির ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে আছেন। তাও বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.)’র শুভ দৃষ্টির ফসল।
হযরত গাউছুল আযম বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.) ছিলেন নবী বংশ ক্রমধারার ২৮তম আওলাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম, অতি উঁচু স্তরের শেখে ফায়াল। তিনি মাত্র ২২/২৩ বছর বয়স থেকেই সংসারের প্রতি অতি বিরাগভাজন ছিলেন। আল্লাহ্র ওয়াহদানিয়াতের অপার সমুদ্রে তিনি নিজেকে নিমজ্জিত করে দিয়েছিলেন। তিনি খুব কম কথা বলতেন। ৪৮ বছর বয়স থেকে তিনি পূর্ণ নিরবতা পালন করেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় ঐশী ক্ষমতাবলে মানবতার প্রভূত মঙ্গল করে চির স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। উদৃতিতে আছে- “মান লাহুল মওলা ফলাহুল কুল” অর্থাৎ- আল্লাহ্ পাক যার জন্য হয়ে যান সবকিছুই তার অধীনস্ত হয়ে যায়।
বর্তমান অশান্ত বিশ্বে বাবাভাণ্ডারী (ক.ছি.আ.)’র অসাম্প্রদায়িক আদর্শ অনুসরণ করা হলে সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের জন্য সারা বিশ্ব হবে শান্তির মহা আবাসস্থল। তাই আসুন! আমরা তাঁর নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করে জীবন ধন্য করি এবং মানবতার কল্যাণে ব্রতী হই। ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের ২২ চৈত্র সোমবার ৭১ বছর বয়সে এই নশ্বর জগত থেকে পর্দা করে পরজগতে তিনি তাঁর প্রেমাস্পদের সান্নিধ্যে চলে যান। প্রতি বছর ২২ চৈত্র চট্টগ্রাম ফটিকছড়িস্থ মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে বিশাল আয়োজনে, মহাসমারোহে তাঁর বার্ষিক ওরশ পালিত হয়। দেশ-বিদেশ থেকে আগত লক্ষ-লক্ষ আশেক-ভক্তের আল্লাহু আল্লাহু ধ্বনীতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে। আল্লাহ্ পাক তাঁর ফয়েজ, রহমত ও বরকত দিয়ে আমাদেরকে ধন্য করুন! আমীন।

Posted in Uncategorized, লেখনী সমূহ | Comments Off on হযরত গাউছুল আযম বাবাভাণ্ডারী মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান (ক.) মানব কল্যাণের পথিকৃৎ শাহ্জাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী

মাতৃভাষা বাংলা আমাদের অহংকার ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই শিশুদের মানসিক বিকাশ সম্ভব-সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী

মাতৃভাষা বাংলা আমাদের অহংকার ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই শিশুদের মানসিক বিকাশ সম্ভব
-সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী

১৫ ফেব্র“য়ারী ২০১৩ শুক্রবার দিনব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টি এস সি সংলগ্ন স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্ত্বরে “মইনীয়া শিশু-কিশোর মেলা”র উদ্যোগে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোরদের নিয়ে চিত্রাংকন ও সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, শিশু-কিশোর মানব বন্ধন এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন মইনীয়া শিশু-কিশোর মেলা, আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়া, সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী ট্রাষ্ট এর সভাপতি ও দরবার-এ গাউছুল আজম মাইজভান্ডারীর বর্তমান সাজ্জাদানশীন আওলাদে রাসুল (দঃ) সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী।

সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন – মাতৃভাষা বাংলা আমাদের অহংকার আর আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। শৈশব থেকেই সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে একটি শিশুর মুক্ত চিন্তা চেতনার বিকাশ সমাজ রাষ্ট্র ও জাতি গঠনে অগ্রনী ভূমিকা রাখতে পারে। শান্তি, সম্প্রীতি, ঐক্য ও প্রগতি বিনির্মাণে দরবার-এ গাউসুল আজম মাইজভান্ডারীর সামাজিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিশুদের অধিকার এবং তাদের মানসিক বিকাশে মইনীয়া শিশু-কিশোর মেলার এই বিশেষ আয়োজন অব্যহত থাকবে। শিশু-কিশোরদের মানসিক উন্নতি সাধনে সুষ্ঠ ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করতে তিনি সমাজের বিত্তবাননের প্রতি আহবান জানান।

বিকেলে সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু,মানবতার শত্র“ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে শিশুদের মানব বন্ধন শেষে পুরস্কার বিতরণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন ঢা বি’র অধ্যাপক ড. আ. ন. ম. রইছউদ্দিন, ড. ওয়াহিদুজ্জামান সহ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের সদস্যবৃন্দ। চিত্রাংকনে – চারটি বিভাগে ১ম, ২য়, ৩য় ছাড়াও অতিরিক্ত পনেরোটি বিশেষ পুরস্কার সহ মোট সাতাশটি পুরস্কার এবং ‘সুন্দর হাতের লেখা’য় চারটি বিভাগে সেরা দশ জন করে চলি¬শটি পুরস্কার মিলিয়ে সর্বমোট সাতষট্টিটি ক্রেষ্ট ও মেডেল বিজয়ীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। পরিশেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

Posted in Uncategorized | Comments Off on মাতৃভাষা বাংলা আমাদের অহংকার ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই শিশুদের মানসিক বিকাশ সম্ভব-সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী

জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ ও মুক্তির দিশারী মহানবী (দঃ) এর আগমন সৃষ্টিকুলের জন্য বিশেষ নিয়ামত-গাজীপুর জেলা ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) মাহফিল ও সুন্নী সম্মেলন সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী ।

জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ ও মুক্তির দিশারী মহানবী (দঃ) এর আগমন সৃষ্টিকুলের জন্য বিশেষ নিয়ামত-গাজীপুর জেলা ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) মাহফিল ও সুন্নী সম্মেলন সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী ।
০৮জানুয়ারী ২০১৩ মঙ্গলবার বাদ এশা হইতে সারারাত ব্যাপী“আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়া”গাজীপুর জেলা শাখার উদ্যোগে পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) উপলক্ষ্যে গাজীপুর পৌরসভা রোডে আন্জুমানের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি এডভোকেট ওয়াজ উদ্দিন মিয়ার সভাপতিত্বে ও আন্জুমানের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন এর সমন্ব^েয় ,ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ) মাহফিল ও সুন্নী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন আওলাদে রাসূল (দঃ),সাজ্জাদানশীন দরবার- এ গাউছুম আজম মাইজভান্ডারী হযরতুলহাজ্ব শাহ্ সূফী সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী ওয়াল-হোসাইনী মাইজভান্ডারী (মা: জি: আ:)। বিশেষ অতিথি ছিলেন এডভোকেট আলহাজ্ব আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এম পি, জাহিদ আহসান রাসেল এম পি, টঙ্গী পৌর মেয়র এডভোকেট আজমত উল¬¬াহ খান, গাজীপুর পৌর মেয়র মোঃ আবদুল করিম, গাজীপুর সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান খান মাইজভাণ্ডারী। বিশিষ্ট ওয়ায়েজীন ছিলেন আল¬¬ামা নূরুল ইসলাম জামালপুরী, মুফতী বাকী বিল¬¬াহ আযহারী, মাওলানা আতাউর রহমান মিরাজী, মাওলানা রুহুল আমিন ভূইয়া চাঁদপুরী, মাওলানা শেখ সাদী মুহাম্মদ আবদুল¬াহ, মাওলানা মুহাম্মদ হাসান, মাওলানা আখতারুজ্জামান গাজীপুরী।
প্রধান অতিথী তার বক্তব্যে বলেন- জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ ও মুক্তির দিশারী মহানবী (দঃ) এর আগমন সৃষ্টিকুলের জন্য বিশেষ নিয়ামত। ইতিহাস থেকে জানা যায় তিনিই মানব জাতিকে দান করে গেছেন মুক্তির সর্বোত্তম পন্থা ইসলাম যা মানবতাবাদী শান্তির ধর্ম। তাঁর আগমনে মুক্তি পেয়েছে সমস্ত সৃষ্ঠি। সমাজ রাষ্ট্র তথা বিশ্বকে শান্তিময় আবাস হিসাবে গড়তে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে আধুনিক ও বিজ্ঞানময় ইসলামের চর্চ্চা একান্ত জরুরী। ধর্মীয় গোড়ামীর কারনে সমাজ আজ অস্থির। ধর্মের নামে স্বীয় স্বার্থ হাসিল করার মানষে সন্ত্রাস,নৈরাজ্য ও জঙ্গীবাদী কার্যক্রমকে কোন অবস্থাতেই ইসলাম সমর্থন করে না বরং যারা এ ধরনের হীন কাজে লিপ্ত তারা মানবতা ও ইসলামের শত্র“। এই রবিউল আউয়াল মাসে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) এর চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সকলকে শান্তিময় রাষ্ট্র গঠনে এবং সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও জঙ্গীবাদ দমনে আন্তরিকতার সাথে কাজ করার মাধ্যমে ইসলামের সত্যিকারের চেতনা মানবতা এবং রাসুলে পাকের আদর্শকে সমুন্নত রাখার আহব্বান জানান।
জনাব আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এম পি বলেন-ওলী আউলিয়ার মাধ্যমে এদেশে ইসলাম প্রচার হয়েছে এবং তারা নবী করিম (সাঃ) এর প্রতিনিধি হিসাবে সমাজে শান্তিপূর্ন ভাবে সহঅবস্থানের বানী প্রচারের মাধ্যমে সম্প্রীতির যে মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহন করতে হবে।
জনাব জাহিদ আহসান রাসেল এম পি বলেন-ইসলাম দাড়িয়েই আছে শান্তির বার্তা নিয়ে। অশান্তি কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। রাসূলে পাক (সাঃ) যেভাবে এবং অলী আউলিয়ারা যেভাবে প্রেম ও ভালবাসার মাধ্যমে মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে এনেছেন তা আমাদের সকলেরই অনুসরন করা নৈতিক দায়িত্ব।
অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খলিফা সাইফুল ইসলাম, গাজীপুর জেলা আন্জুমান সম্পাদক আবুল খায়ের মিয়া, খলিফা,মোঃ বশীর মিয়া মাইজভান্ডারী,অন্যান্য খলিফাবৃন্দ, আনজুমানের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ সহ কয়েক হাজার স্থানীয় জনগন ও ভক্ত আশেকানবৃন্দ।
পরিশেষে সম্মানিত প্রধান অতিথি গাজীপুরকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষনা কবায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং দুরুদ মিলাদ ও জিকিরের পর সকল বিশ্ববাসী, দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করে মোনাজাত করেন।

Posted in Uncategorized | Comments Off on জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ ও মুক্তির দিশারী মহানবী (দঃ) এর আগমন সৃষ্টিকুলের জন্য বিশেষ নিয়ামত-গাজীপুর জেলা ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) মাহফিল ও সুন্নী সম্মেলন সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী ।

ধর্মে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিঃ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা ডক্টর ম. আখতারুজ্জামান- অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘ধর্মীয় দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিশ্ব শান্তি’ শীর্ষক সেমিনার উপস্থাপিত ধারণাপত্র
২৪ নভেম্বর ২০১২
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, কাকরাইল,ঢাকা।

ধর্মে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিঃ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা
ডক্টর ম. আখতারুজ্জামান-
অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আভিধানিক অর্থে ধর্ম (জবষরমরড়হ) হলোঃ “অ ংঢ়বপরভরপ ভঁহফধসবহঃধষ ংবঃ ড়ভ নবষরবভং ধহফ ঢ়ৎধপঃরপবং মবহবৎধষষু ধমৎববফ ঁড়হ নু ধ হঁসনবৎ ড়ভ ঢ়বৎংড়হং ড়ৎ ংবপঃং,” অর্থৎ “কোন লোকগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সাধারণ ঐকমত্যে গৃহীত এক সেট নির্দিষ্ট মৌলিক বিশ্বাস ও অনুশীলন।” (বিনংঃবৎ’ং ঊহপুপষড়ঢ়বফরপ টহধনৎরফমবফ উরপঃরড়হধৎু, হবি ৎবারংবফ বফরঃরড়হ ১৯৯৬, ংা ঢ়.১২১২) ধর্মের সংজ্ঞায়ন একটি জটিল তার্কিক বিষয়। তবে এর সর্বোত্তম সংজ্ঞায়ন যেভাবেই করা হোক না কেন ধর্ম অভিধাটি স্পষ্টত কতিপয় বৈশিষ্ট্যের ধরনকে ইঙ্গিত করে যার মধ্যে থাকে বিশ্বাস, অনুশীলন, অনুভূতি, জীবনবোধ, মনন, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। (ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরপং বফ. ঔধসবং ঐধংঃরড়হমং, াড়ষ.১০, .৬৬২) এ অর্ধে ধর্মের পরিধি ব্যাপক, বি¯তৃত। এটি বহুমাত্রিক। ধর্ম সকল মানুষের। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন পরিচয়ে। ধর্ম মানুষের জন্য, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। আসলে মানুষের জন্যই সবকিছু। সেজন্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ মধ্য যুগের বাংলার কবি চন্ডীদাস (চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতক) এর এই স্মরণীয় উক্তি, আল-কুরআন এর উল্লিখিত বাণীরই প্রতিধ্বনি। বিদ্রোহী কবি, মরূকবি কাজী নজরুল ইসলামও ধর্ম, জাতি, গোত্রের চেয়ে মানুষই যে সর্বশ্রেষ্ঠ সে কথা আরো জোরালোভাবে বলেছেন তাঁর সাম্যবাদী কাব্যে ও ‘মানুষ’ কবিতায়ঃ
“গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।” (আবদুল কাদির সম্পাদিত, নজরুল রচনাবলী, প্রথমখন্ড, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬, পৃ.২৩৪)

বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বিভক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ে। তাদের মধ্যে বিরোধ, বৈরীতা ও রক্তপাতও দৃশ্যমান হয়েছে ইতিহাসের পথ পরিক্রমায়। অথচ সাম্প্রদায়িকতার এ বিষয়টি ধর্মীয় নীতিমালা বা অনুশাসনে তো নেই-ই, বরঞ্চ রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবতারবাদী চেতনার সুমহান আদর্শ।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেশ হলেও, এটি বহু ধর্ম সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্র একটি বহুমাত্রিক দেশ, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানাবিধ ধর্মের মানুষ বহুদিন ধরে, কিছু বিচ্ছিন্ন অনভিপ্রেত ঘটনা ব্যতীত, একত্রে সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ আবেদন বাংলাদেশের প্রধান ধর্মসমূহে কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার ইঙ্গিত দেয়ার প্রয়াস এ ধারণাপত্রে।
ইসলাম ধর্ম
ইসলাম শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে ‘সাল্ম’ থেকে। ‘সাল্ম’ অর্থ শান্তি। আল্-কুরআন ও মহানবী (সাঃ) প্রচারিত ধর্মকে বলা হয় ইসলাম। ইসলাম বলতে বুঝায় শান্তির পথে অনুপ্রবেশ, আর এর অনুসারী মুসলিম বলতে বোঝায় আল্লাহর ও মানবাত্মার সাথে শান্তি স্থাপন। মুসলিম হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসলাম পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও প্রেরিত পুরুষ এবং তাদের নির্দেশিত ধর্মসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন। (আল-কুরআন ২ঃ৪)
পবিত্র কুরআন সমগ্র মানব জাতিকে একই পরিবারের অন্তর্র্ভক্ত হিসেবে ঘোষণা করে সকল মানুষের মধ্যে সাম্য ও ঐক্যের ধারণা দিয়েছে। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের উৎস এক ও অভিন্ন। আল-কুরআন বলে, “হে মানবজাতি” তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন, তার থেকেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং দু’জন থেকে বহু সংখ্যক নারী ও পুরুষ বিস্তার ঘটিয়েছেন।” (আল্-কুরাআন ৪ঃ১)।
বস্তুতঃ অভিন্ন উৎস থেকেই মানুষ বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, গোত্র ও দলে বিভক্ত হয়েছে। কেন মানুষকে বিভিন্ন গোত্রে ও জাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে সে বিষয়টি পবিত্র কুরআন খোলাশা করে বলেছে এভাবে, “হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে, এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পার।” (সূরা হুজুরাত ৪৯ঃ১৩)। পরস্পরের সাথে পরিচিত হওয়া সদ্ভাব সম্প্রীতির প্রকৃষ্ট উপায়।
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত যে সবচেয়ে খোদাভীরু” পবিত্র কুরআনের (৪৯ঃ১৩)। এই মহৎ বক্তব্যেও সমর্থনে মহানবী (দঃ) মানুষের মধ্যে সাম্য ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে বিদায় হজ্জেও ভাষণে ঘোষনা করেছেনঃ “তোমরা সকলে ভাই ভাই এবং সকলেই সমান। তোমাদের কেই অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারনা। একজন আরব একজন অনারবের উপর এবং একজন অনারব একজন আরবের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। অনুরূপভাবে একজন শ্বেতাঙ্গ একজন কৃষ্ণাঙ্গের উপর এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ একজন শ্বেতাঙ্গের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। কেবল ন্যায়পরায়নতার ভিত্তিতে প্রাধান্য প্রাপ্তি ব্যতীত”। (গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.৩৪০)।

এভাবে ইসলাম জাতি, ধর্ম ও বর্ণের আভিজাত্য, ধনেশ্বর্যের অহংকার, পদমর্যদা ও জ্ঞান গরিমার আস্ফালনকে চুরামান করে সকল মানুষকে সাম্যের শিকলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, ‘ইসলামের বিশ্বজনীন মানবাতবোধঃ সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব,’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৭০-৭২, ফেব্র“য়ারী, ২০০২, পৃ.১৪১)।

পবিত্র কুরআন যে বারবার ‘হে মানব জাতি’ এবং ‘হে আদম সন্তানেরা’ বলে সম্বোধন করে থাকে সেটা এজন্য করে থাকে, যাতে মানুষের মনে মানবীয় ঐক্যের ধারণা সৃষ্টি ও তা বদ্ধমূল হয়ে যায়। অনুরূপভাবে ‘হে ঈমানদারগণ’ এবং ‘হে মুমিনগণ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে যাতে তাদের ভেতরে বংশীয় বা শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টির অবকাশ না থাকে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৪১)।

মানবপ্রেম, বিদ্বেষহীন আচরণ, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির আদর্শই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা। “নিশ্চয়ই মানবজাতি একখন্ড সমাজ” পবিত্র কুরআনের (২:২১৩) এই উদাত্ত ঘোষনার ব্যাখায় বিদায় হজ্বের ভাষণে সমাজের মানুষের প্রতি ভালবাসা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে মহানবী (দঃ) বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহরই পরিবার। যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তবে মানবজাতিকে ভালবাস। যদি সেই প্রভুর (আল্লাহর) সামনে যেতে চাও, তবে তাঁর সৃষ্টজীবকে ভালবাস: যা তোমরা নিজের জন্য পছন্দ কর তাদের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য বর্জন কর, তাদের জন্য তাই বর্জন করবে। তুমি তাদের প্রতি সেই ব্যবহার কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর। তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করোনা, পরস্পর হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না, তোমরা আল্লাহর দাস ও পরস্পর পরস্পরের ভাই হয়ে যাও”। (সৈয়দ বদরুদ্দোজা, হযরত মুহাম্মদ (দঃ): তাহার শিক্ষা ও অবদান ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ.৪৯-৫০, উদ্ধৃতি, মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, প্রগুক্ত, পৃ.১৪২)। বস্তুত: ইসলাম সমগ্র পৃথিবীবাসী, মানুষ, প্রাণী ও জীব জগতের প্রতি সার্বজনীন ভালবাসা ও দয়ার আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) বলেছেন, “যারা দয়া করে দয়াময় আল্লাহ্ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন”। (তিরমিযি ও আবু দাউদ, উদ্ধতি: দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ২০০০ পৃ. ৩৮)।
সার্বজনীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায় মোহাজের (মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকারী) ও আনসার (মদিনাবাসী)-এর মধ্যে ‘ভাই’ সম্বন্ধ স্থাপনের মধ্যে। মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতাব্দীর বিবাদ ভুলিয়ে মহানবী (দঃ) তাদের সাধারণ নাম দিয়েছেন আনসার (সাহায্যকারী)। বস্তুত: ঐতিহাসিক মদিনা সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গবফরহধ)-এর ভিত্তিতে মহানবী (দঃ) এর নেতৃত্বে মদিনা আদর্শ রাষ্ট্র গঠন হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনা তথা মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর সমাগত অপরাধীদের প্রতি মহানবীর (দঃ) ঘোষণা, “তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও তোমরা মুক্ত -ক্ষমা, মহানুভবতা ও মানবিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একইভাবে সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী সেন্টক্যাথেরিন মঠের সাধু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে মহানবী (দঃ) তাদের জীবন, ধর্ম ও সম্পত্তি রক্ষার যে সনদ প্রদান করেন, তা নিজ ধর্মের রাজাদের কাছ থেকেও তারা কখনো পাননি বলে ইতিহাসে প্রমান মেলে। (সৈয়দ আমির আলী, দি স্পিরিট অব ইসলাম [বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মদ দরবেশ আলী খান] ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.১২৮)।
মহানবী (দঃ) বলতেন, “যে ব্যক্তি জিম্মির (ঢ়ৎড়ঃবপঃবফ হড়হ-গঁংষরসং) প্রতি অন্যায় ব্যবহার করবে এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তার উপর চাপিয়ে দিবে আমি পরকালে তার জন্য অভিযোগকারী হবো”। (মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ইসলাম প্রসঙ্গ, রেনেসার্স প্রিন্টার্স, ঢাকা ১৯৬৩, পৃ.৭২)। বস্তুত: সহনশীলতা হলো সেই গুন যা ইসলাম ধারণ করে উদার ও মানবিক গুনে অনন্য সাধারণ। এতদবিষয়ে ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরবং- যথার্থই বলা হয়েছে, “ঞযব ৎবপড়মহরঃরড়হ ড়ভ ৎরাধষ ৎবষরমরড়ঁং ংুংঃবসং ধং ঢ়ড়ংংবংংরহম ফরারহব ৎবাবষধঃরড়হ মধাব ঃড় ওংষধস ভৎড়স ঃযব ড়ঁঃংবঃ ধ ঃযবড়ষড়মরপধষ নধংরং ভড়ৎ ঃযব ঃড়ষবৎধঃরড়হ ড়ভ হড়হ গঁংষরসং” অর্থাৎ ‘প্রতিদ্বন্দি বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক উৎসের স্বীকৃতি দেয়ার শুরু থেকেই ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি সহনশীলতার ধর্মতাত্বিক ভিত্তি লাভ করেছে’।
বস্তুত: ‘লা এক্রাহা ফিদ্ দ্বীন’ (ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই) এবং ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়াদ্বীন’ (তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য) পবিত্র কুরআন-এর এই অমোঘ বাণী বিশ্বের অন্যান্য ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়া ও মেনে নেয়ার এক সুস্পষ্ট চুড়ান্ত নির্দেশ।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-এর আদর্শ ধারণ করেই মুসলিমরা বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, খুব কম সময়ে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমৃদ্ধ, উদার, মানবতবাদী চেতনার সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মানে সক্ষম হয়েছিল। ইসলাম শিক্ষা বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আব্দুর রশিদ যথার্থই বলেন যে, ‘সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের গুনেই বিশ্বমানবের কল্যান সাধন করা, বিশ্বশান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্ব বন্ধুত্ব স্থাপন করা তাদের (মুসলিমদের) পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। যে রাষ্ট্রে বা সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এই আদর্শের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়, সে রাষ্ট্র বা সমাজ মুসলিম রাষ্ট্র বা সমাজ নয়। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৫৬)।

হিন্দু ধর্ম
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় হিন্দু ধর্মের লক্ষণ সম্পর্কে বহা হয়েছে:
“অহিংসা সত্যমস্তেয়ং শৌচং সংযমমেব চ
এতৎ সামাসিকং প্রোক্তং ধর্মস্য পঞ্চলক্ষণম্ ॥”
অর্থাৎ হিংসা না করা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, শুচি থাকা এবং সত্যাশ্রয়ী হওয়া-এই পাঁচটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ। অহিংসা আচরণ তখনই সম্ভব, যখন আমরা সমদর্শী হব অর্থাৎ সকল মানুষকে নিজের মতো মনে করব। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬/৩২)।
মনুসংহিতার মতে ধর্ম হচ্ছে কতগুলো গুণের সমষ্টি। উক্ত হয়েছে-
“ধৃতিঃ ক্ষা দমোহস্তেয়ং
শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো
দশকং ধর্মলক্ষণম্ ॥” (মনুসংহিতা, ৬/৯২)
অর্থাৎ সহিষ্ণুতা (ধৈর্য), ক্ষমা (ক্ষমাশীলতা), আত্ম-সংযম, চুরি না করা (পরস্ব অপহরণ না করা), শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, শুদ্ধবুদ্ধি (প্রজ্ঞা), বিদ্যা (জ্ঞান), সত্য এবং অক্রোধ (ক্রোধহীনতা) এই দশটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ।
এই দশটি গুন যিনি যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারেন তাঁর মধ্যে মানুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। এ আলোকে হিন্দুধর্ম কোন বিশেষ স্থান, কাল, জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে ধর্মাচরনের বিধান দেয় নি। সকল দেশের, সকল কালের, সকল মানুষের পক্ষে যা কল্যাণকর সেটিই হচ্ছে হিন্দুধর্মের নির্দেশনা। হিন্দুধর্ম বহু মত ও পথের সমন্বয়ে সৃষ্টি। অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী, একেশ্বরবাদী, আস্তিক, নাস্তিক, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি বিভিন্ন ধারার বিশ্বাস মত ও পথ এর ধর্মদেহে লীন হয়েছে একান্তভাবে। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন- ‘যত মত তত পথ’। ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান’-এটাই হিন্দুধর্মের মূল চেতনা। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তা এখানে স্বীকার্য। মানবিক মূল্যবোধে, মানবিক কল্যাণে যা কিছু তা এখানে গ্রহণীয়। এটা কেবল সম্ভব মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বিভিন্ন মত ও পথের প্রতি সীমাহীন সহিষ্ণুতা ও প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ থেকে। হিন্দুধর্মের এই যে ঔদার্য, বিশালতা, মানবিক বিকাশের ধারা এবং তার অন্তরের সঞ্জীবনী শক্তি তা নিঃসন্দেহে নন্দিত।
হিন্দুধর্ম বিশ্বাসে কেবল সর্বজনীন সহনশীলতাই নেই বরং এখানে একটা দৃঢ় প্রতীতি আছে যে পৃথিবীতে যদি কোনো একটি ধর্ম সত্য হয় তাহলে অন্য ধর্মগুলোও সত্য। সকল ধর্মে, সর্বকালে এবং সব দেশেই হতে পারে অবিনাশী বাণীর উচ্চারণ ও মহিমান্বিত পুরুষের আবির্ভাব। হিন্দুধর্মের মানবিক ঔদার্য্য, চিন্তার প্রসারতা, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি বিচার বিশেষণ করে একে যদি কেউ বলে ‘মানবধর্ম’ তাহলেও অত্যুক্তি হবে না।
হিন্দুধর্মের প্রধান দিক সকল জীবের মধ্যে ঈশ্বর দর্শন, সকলকে ভালোবাসাই ধর্ম- এই চেতনাটি বীর সন্ন্যাসী বিবেকান্দের ভাষায় প্রতিফলিত হয়েছে অনুপমভাবে-
“ব্রহ্ম হতে কীট-পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মনপ্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে এ সবের পায়।
বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন ও সাম্যের বাণী প্রচারই হিন্দু ধর্মে মূল লক্ষ্য। বেদ, উপনিষদ, রাময়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সহ প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই জীবের প্রতি ভালোবাসার কথা, মানবকল্যাণের কথা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাম্যের (শান্তির) বাণী প্রচারিত হয়েছে। উক্ত হয়েছে-
“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম॥
এম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ”।
(শ্রীমদ্বদ্গীতা, ৪/১১)
অর্থাৎ ‘হে পার্থ’ যে আমাকে যেভাবে উপাসনা করে, আমি তাকে যেভাবেই তুষ্ট করি। মনুষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথের অনুসরণ করে’।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী মহাপুরুষগণের ধর্মচিন্তার প্রধানভিত্তি মানবতাবাদ। তাঁরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখতেন এবং সকল ধর্মের মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসতেন। লোকনাথ ব্রক্ষচারী বলেছেন-
“ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য এসবই
জগতের ব্যবহারিক সত্য, মনের
সৃষ্টি। আমি যে জগতের লোক
সেখানে নেই কোনো ভেদ, সেখানে
সবই সমান-সবই সুন্দর”॥
অর্থাৎ ‘তোমরা সংযুক্ত হও, একবিধ বাক্য প্রয়োগ কর, তোমাদের মনসমূহ জ্ঞাত হোক সমানরূপে। তোমাদের সংকল্প সমান, তোমাদের হৃদয়সমূহ সমান এবং সমান হোক তোমাদের আন্তঃকরণসমূহ। যাতে তোমাদের পরম ঐক্য হয়, তাই হোক’।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “যুদ্ধ নয়, সহমর্মিতা; ধ্বংস নয়,সৃষ্টি; সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতি’। তিনি আরো বলেছেন ‘বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি’। বস্তুত: বিশ্বশান্তির জন্য প্রয়োজন হিন্দুধর্ম প্রস্ফুটিত মহান ঐক্য ও সম্প্রীতির বাণী মনেপ্রাণে ধারণ করে কাজ করা।
ওঁ শান্তি (ওম্ শান্তি)- এতো সকল মানুষের জন্যই শান্তি কামনা, কাউকে বাদ দিয়ে নয়। এটি হিন্দু ধর্মের সার্বজনীন সদ্ভীব ও সম্প্রীতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরন।

বৌদ্ধ ধর্ম
আজ থেকে আড়াইহাজার বছর পূর্ব জন্মালাভকারী মহামানব গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত ধর্ম বৌদ্ধধর্ম নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মানবসভ্যতায় ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবিক সাধনার এক অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত বুদ্ধজীবন। বুদ্ধের চিন্তা-চেতনা ও কর্মের মধ্যে মানবের কল্যাণ প্রকৃষ্টভাবে দেখা যায়।

বুদ্ধ লোভ-দ্বেষ-মোহ পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন। মানুষের কল্যাণ, সুখ-শান্তি, দুঃখমুক্তির কথা বলেছেন। তিনি সকল মানুষকে এক এবং অভিন্ন করে দেখতেন। তিনি ধর্মপ্রচার করার সময় তাঁর শিষ্যদেরকে উপলক্ষ্য করে বলেছিলেন; ‘হে ভিক্ষুগণ! বহুজনের সুখের জন্য, বহুজনের মঙ্গলের জন্য তোমরা দিকে দিকে বিচরণ করো, এমন ধর্ম দেশনা করো যার আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ (মহাবর্গ পৃ.২২)। বুদ্ধের এই বাণী চিরন্তন এবং চিরশ্বাশত। এখানে বুদ্ধ সকল সম্প্রদায়ের সুখ ও মঙ্গলের কথা বলেছেন। সকলের কল্যাণের কথা বলেছেন। পারস্পরিক সদ্ভাব-সম্প্রীতির কথা বলেছেন।
বুদ্ধ মানুষে মানুষে এমন কি নারী-পুরুষে ভেদাভেদ করেননি। তিনি সাম্যেও ধারণা দিয়েছেন। তাঁর ধর্মে নেই কোন জাত-অজাতের অভিমান। তিনি বলেছিলেন: গঙ্গা, যমুনা প্রভৃতি বড় বড় নদী যেমন সমুদ্রে মিলে স্বতন্ত্র সত্তা ও নাম হারিয়ে অনুরূপভাবে ব্রাক্ষন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ ভিক্ষু-সঙ্ঘে স্থান পায়। তিনি ছিলেন রাজপুত্র। তিনি ধনী-গরীব, উচু-নীচু সবাইকে ভালোবাসতেন। শুধু তাই নয়, সকলকে তাঁর ধর্মে অংশ গ্রহন করারও সুযোগ করে দিতেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্যে শান্তিময় জীবনযাপন প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন: ‘বৈরীদের মধ্যে বৈরীহীন হয়ে, হিংসাকারীদের মধ্যে অহিংস হয়ে সুখে জীবনযাপন করো’। (ধর্মদপ/গাথা সংখ্যা,১৯৭)। মৌমাছি যেমন ফুলের বর্ণগন্ধ ও আকৃতি বিনষ্ট না করে শুধু মধু আহরণ করে, তেমনি মানুষকেও সমাজে কারো ক্ষতি বা অনিষ্ট না করে শুদ্ধভাবে জীবনযাপন করা উচিত। তিনি আরো বলেন: ‘খারাপ চরিত্র সম্পন্ন ব্যাক্তির নিন্দা ও অকীর্তি প্রচার হয়। গুণী, পন্ডিত, বিনয়ী ব্যাক্তির প্রশংসা ও গুণকীর্তি অর্জন লাভ করে’ (থের গাথা, পৃ.৩৬২)। এখানে তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সলকে উপলক্ষ্য করেই এই উপদেশ প্রদান করেছিলেন।
সংযমের মাধ্যমে পরিচালিত চিত্তই সবাইকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন; ‘বৈরী বৈরীর বা শত্র“র শত্র“র যে অনিষ্ট সাধন করে, বিপথে পরিচালিত চিত্ত তাঁর চেয়ে অধিক অনিষ্টকারী হয়’ (ধর্মপদ, গাথা সংখ্যা ৪২)। এখানে চিত্ত সংযমের কথা বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে সকল প্রকার সম্প্রীতি-সদ্ভাব বিনষ্ট হওয়ার পেছনে এই মন বা চিত্তই প্রধান ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বুদ্ধ, মনকে সংযত করার কথা বলেছেন।

বিশ্বে কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় বৌদ্ধধর্ম তার নির্দেশনা রয়েছে। শুধু মানুষ নয়, যে কোনো প্রাণীর প্রতি হিংসা করা ও পাপ। বুদ্ধবাণীর মূল কথা হলো অহিংসা, সর্বজনীন শান্তি, মৈত্রী, পরমতসহিষ্ণুতা, উদারতা। এই উপদেশগুলো সর্বকালের এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য।
লোভ-দ্বেষ-মোহের কারণে মানুষ মানসিক এবং শারীরিক অশান্তি, দুঃখ, যন্ত্রণা পায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধের ‘অহিংসা পরম ধম্ম’ ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। শান্তি বিনষ্টকারী সকল প্রকার প্রচেষ্টা ও কার্যকলাপ বৌদ্ধধর্মে নিশিদ্ধ। বুদ্ধের নিষিদ্ধ পঞ্চ বানিজ্যেও মধ্যে মদ, বিষ, মৎস, প্রাণী এবং অস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:
সব্বে তসন্তি দন্ডস্স সব্বেসং জীবিতং পিয়ং
অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয়্য ন ঘাতয়ে। (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা, ১২৯)
অথাৎ, ‘সকলেই দন্ডকে ভয় পায়। কেননা, জীবন সকলের প্রিয়। নিজের সাথে তুলনা করে কাউকে আঘাত বা হত্যা করবে না’। বুদ্ধ অস্ত্র বা শক্তির জয় অপেক্ষা আত্মজয়কে শ্রেষ্ঠ জয় বলেছেন। তিনি বলেন: ‘যিনি যুদ্ধে হাজার বার হাজারো মানুষকে জয় করেন তার সেই জয় অপেক্ষা যিনি একমাত্র নিজেকে জয় করেছেন তিনিই শ্রেষ্ঠ বিজয়ী’। বুদ্ধ আরো বলেন: ‘অক্রোধের দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, সাধুতা দ্বারা অসাধুকে জয় করবে, সত্যের দ্বারা মিথ্যাকে জয় করবে, ত্যাগ দ্বারা কৃপণকে জয় করবে’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/৫)। বুদ্ধের অন্যতম শিক্ষা হলো ‘জগতে শত্র“তার দ্বারা শত্র“তার কখনো প্রশমিত হয় না। শত্র“তাহীনতার দ্বারাই শত্র“তা উপশম হয়’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/২২৩)।

সুত্র নিপাত নামক গ্রন্থের ‘মৈত্রী সূত্রে’ উক্ত হয়েছে: ‘কেউ কাকেও বঞ্চনা করবে না। ছোট-বড়, উত্তম-অধম বলে কাকে অবজ্ঞা করবে না, ক্রোধ বা হিংসা করবে না, কেউ কারো দুঃখ কামনা করবে না। মা যেমন নিজের জীবনের বিনিময়ে তার একমাত্র সন্তানকে রক্ষা করেন তদ্রুপ সকল প্রাণির প্রতি অপরিমেয় মৈত্রী পোষণ করবে’ (পৃ.৩৬)। আদর্শ সমাজ, পরিবার, উন্নত জীবনগঠন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিশ্বশান্তি ও ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ়করণে বুদ্ধবাণী অপরিহার্য।

সব্বে সত্তা সখিতা অর্থাৎ: ‘সকলের মঙ্গল হোক, কল্যাণ হোক’। বুদ্ধের এই অমোঘ বাণী সকল সম্প্রদায়ের, সকল মানুষের জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক অসাধারণ বাণী।

খ্রিস্টধর্ম
পবিত্র বাইবেল ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে মানুষের আচরণের প্রধান চালিকাশক্তি হলো ধর্ম। প্রকৃত ধর্মের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে মানুষের কর্মে, অপর মানুষের প্রতি তার আচরণে। ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য সৃষ্ট হয়নি। বাইবেলে প্রবক্তা মীমা প্রকৃত ধর্মের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “ ঞড় ধপঃ লঁংঃষু, ষড়াব ঃবহফবৎষু ধহফ ধিষশ যঁসনষু নবভড়ৎব এড়ফ.” অর্থাৎ ধর্ম হলো ‘ন্যায় সঙ্গতভাবে কাজ করা, কোমল হৃদয়ে ভালবাসা এবং বিনম্রচিত্তে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে যাওয়া’।

বাইবেলের আদি পুস্তকে মানব পরিবারের যাত্রা শুরুর কথা বলা হয়েছে: ‘ঈশ্বর তাঁর মূর্তিতে আপন ‘সাদৃশ্যে’ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের পুরুষ ও নারী করেই সৃষ্টি করলেন। ঈশ্বর মানুষকে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমরা প্রজাবন্ত হও ও বংশ বৃদ্ধি কর”। (আদিপুস্তক ১:২৬-২৭)। এভাবে পরিবার মিলন, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনে একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ বিনির্মিত হয়েছে।
খ্রিস্টধর্ম মতে, জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেহেতু মানুষ, সবার জীবনের উৎস যেহেতু এক ও অভিন্ন সকলের সৃষ্টিকর্তাও যেহেতু মাত্র একজন, তাই সকল মানুষই এক মানব পরিবারের সদস্য-সদস্যা। বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিষ্ঠাতা কোন নিদিষ্ট জনগোষ্টিার নয়, অধিপত্যবাদেও স্থান ধর্মে নেই। রয়েছে সার্বজননীনতা।

‘নতুন বিশ্ব’ বাইবেলের ভাষায় নতুন স্বর্গ ও নতুন পৃথিবী, যেখানে ‘মানুষেদের মাঝখানে পরমেশ্বরের আবাস। তিনি তাদের সঙ্গে বসবাস করবেন; তারা হবে তাঁর আপন জাতি। স্বয়ং পরমেশ্বর তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবেন; তিনি হবেন তাদের আপন ঈশ্বর, তাদের চোখ থেকে মুছিয়ে দেবেন সমস্ত অশ্র“জল। তখন মৃত্যু আর থাকবে না, থাকবেনা আর শোক, আর্তনাদ, দুঃখ যন্ত্রণা’ (প্রত্যাদেশ ২১, ৩খ-৪ক)
বাইবেলে বর্ণিত ঐশি বিষয়াবলি বিশ্লেষণ করে ১৯৬৫-এ দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভায় (ঠধঃরপধহ ঈড়ঁহপরষ ১১) ‘অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর (ঈযঁৎপয) সম্পর্ক বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ -এ বলা হয় যে, ‘সব মানুষ মিলেমিশে একটি সমাজ গঠিত হয়, কারণ সব মানুষ এসেছে একই উৎসমূল থেকে যা ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন সারা পৃথিবীটাকে মানুষের বাসভূমি করার জন্য। সব মানুষ একই গন্তব্যের দিকে তথা ঈশ্বরের দিকে ধাবিত। ঈশ্বরের তত্ত্বাবধান, তার সুস্পষ্ট উত্তমতা ও ত্রাণমূলক পরিকল্পনা সকল মানুষের জন্য পরিব্যপ্ত; সকল মানুষ পূণ্য নগরীতেই একত্রিত হবে’। এ আলোকে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়কে স্বীকার করে এ-ঘোষণায় বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিরাজমান অন্যান্য ধর্ম নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক বিধান ও পূর্জা অর্চনার মাধ্যমে জীবন যাত্রার সুবিন্যস্ত প্রণালী উদ্ভাবন করে নিজ নিজ উপায়ে চেষ্টা করে থাকে মানব হৃদয়কে শান্ত করার জন্য। মানুষে মানুষে, এমনকি জাতিতে জাতিতে একতা ও ভালবাসা লালন করার জন্য খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কী কী বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করা যায় তার প্রতি গুরুত্বরোপ করা হয়। সবশেষে সকল খ্রিস্টভক্তদের প্রতি আহবান জানানো হয় যেন তারা তাদের বিশ্বাস ও জীনবযাত্রার সাক্ষ্য দিতে দিতে অখ্রিস্টানদের মধ্যে বিরাজমান আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্যগুলো এবং তাদের সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতি যেন স্বীকার, সংরক্ষণ ও উৎসাহিত করেন।

ভালবাসা খ্রিস্ট ধর্মমতের এক মৌলিক শিক্ষা। ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এতই নির্ভরশীল যে, পবিত্র শাস্ত্র বলে, “যে ভালবাসেনা, সে পরমেশ্বরকে মানে না”। পূণ্য প্রেরিত পিতর ও পলের অনুসরণ করে ভাতিকান সহাসভা খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসীদের অনুরোধ জানায় যেন বিধর্মীদের প্রতি তারা সদাচরণ করে চলেন এবং নিজেদের পক্ষ থেকে সব মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করে স্বর্গীয় পিতার সত্যিকার সন্তান হয়ে উঠেন। (দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভা “অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর সম্পর্ক বিষয়েক ঘোষণাপত্র”, ২৮ অক্টোবর, ১৯৬৫)।
প্রয়াত পোপ দ্বিতীয় জন পল-এর ভাষায়, “চবধপব ফবসধহফ ধ সবহঃধষরঃু ধহফ ধ ংঢ়রৎরঃ যিরপয নবভড়ৎব ঃঁৎহরহম ঃড় ড়ঃযবৎং, সঁংঃ ঢ়বৎসবধঃব যরস যিড় রিংযবং ঃড় নৎরহম ঢ়বধপব. চবধপব রং ভরৎংঃ ধহফ ভড়ৎবসড়ংঃ ঢ়বৎংড়হধষ, নবভড়ৎব রঃ রং ংড়পরধষ. অহফ রঃ রং ঢ়ৎবপরংবষু ঃযরং ংঢ়রৎরঃ ড়ভ ঢ়বধপব যিরপয রঃ রং ঃযব ফঁঃু ড়ভ বাবৎু ঃৎঁহ ভড়ষষড়বিৎ ড়ভ ঈযৎরংঃ ঃড় পঁষঃরাধঃব”. এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ এর ৩-৪ জুলাই ‘মুসলমান-ক্যাথলিক যোগাযোগ কমিশন’ – এর উদ্যোগে ‘বিশ্বায়ন যুগে ধর্ম ও সভ্যতার সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনায় পরিসমাপ্তিতে এক যুক্ত ইশতিহারে বিশ্বায়নের গুরুত্ব ও শুভফল স্বীকার করে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয় কতিপয় ভয়ঙ্কর দিকের কথা ‘যা সর্বজন স্বীকৃত ও ন্যায্য নীতিমালা প্রণয়নে, ধর্মরে প্রতি সম্মান এবং মানুষের কৃষ্টিগত মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সাথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে’। পরিশেষে মুসলমান ও ক্যাথলিক যৌথ কমিশন একমত হয়ে বলেছেন যে, সংলাপের কৃষ্টি গড়া, ভোগবাদের প্রতিরোধ করা উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সকল প্রকার বৈষম্য বর্জন করার জন্য তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।

উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশের তথা বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিটির মৌলিক দর্শন এক ও অভিন্ন। আর তা হলো অহিংসা, ভালবাসা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধারণা। মানবজাতি এখানে মূল উপজীব্য। মানব প্রেম ও মানব কল্যান সাধন সকল ধর্মের মূল-শিক্ষা। মানবতাবাদী চেতনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনেই ধর্মের সাফল্য নিহিত। ভারতবর্ষে এ আদর্শের ব্যতায় অবলোকন করে বিশ শতকের ত্রিশের দশকে হিন্দু মুসলমান প্রবন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন: “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাধনে তাকে বাঁধতে পারেনা, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটিকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে, রাষ্ট্রিক স্বার্থবৃদ্ধি কি সে দেশকে বাঁচাতে পারে?’ (‘হিন্দু মুসলমান ২’, কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী, (স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সম্পাদিত), দ্বাদশ খন্ড, ঐতিহ্য সংস্করণ, জানুয়ারী ২০০৪, পৃ.৭০৬)।
বস্তুত: হোমো, স্যাপিয়েন্স লিন (ঐড়সড় ংধঢ়রবহং খ) পরিবারের সদস্য হিসেবে মানবতাবাদী চেতনার সূত্রে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখাই হলো সকল ধর্মের মূল শিক্ষা।
ঝঁভর টহরঃু ঋড়ৎ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঝড়ষরফধৎরঃু (ঝটঋওঝ) আয়োজিত
‘ধর্মীয় দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিশ্ব শান্তি’ শীর্ষক সেমিনার উপস্থাপিত ধারণাপত্র
২৪ নভেম্বর ২০১২
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, কাকরাইল,ঢাকা।

ধর্মে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিঃ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা
ডক্টর ম. আখতারুজ্জামান-
অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আভিধানিক অর্থে ধর্ম (জবষরমরড়হ) হলোঃ “অ ংঢ়বপরভরপ ভঁহফধসবহঃধষ ংবঃ ড়ভ নবষরবভং ধহফ ঢ়ৎধপঃরপবং মবহবৎধষষু ধমৎববফ ঁড়হ নু ধ হঁসনবৎ ড়ভ ঢ়বৎংড়হং ড়ৎ ংবপঃং,” অর্থৎ “কোন লোকগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সাধারণ ঐকমত্যে গৃহীত এক সেট নির্দিষ্ট মৌলিক বিশ্বাস ও অনুশীলন।” (বিনংঃবৎ’ং ঊহপুপষড়ঢ়বফরপ টহধনৎরফমবফ উরপঃরড়হধৎু, হবি ৎবারংবফ বফরঃরড়হ ১৯৯৬, ংা ঢ়.১২১২) ধর্মের সংজ্ঞায়ন একটি জটিল তার্কিক বিষয়। তবে এর সর্বোত্তম সংজ্ঞায়ন যেভাবেই করা হোক না কেন ধর্ম অভিধাটি স্পষ্টত কতিপয় বৈশিষ্ট্যের ধরনকে ইঙ্গিত করে যার মধ্যে থাকে বিশ্বাস, অনুশীলন, অনুভূতি, জীবনবোধ, মনন, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। (ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরপং বফ. ঔধসবং ঐধংঃরড়হমং, াড়ষ.১০, .৬৬২) এ অর্ধে ধর্মের পরিধি ব্যাপক, বি¯তৃত। এটি বহুমাত্রিক। ধর্ম সকল মানুষের। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন পরিচয়ে। ধর্ম মানুষের জন্য, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। আসলে মানুষের জন্যই সবকিছু। সেজন্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ মধ্য যুগের বাংলার কবি চন্ডীদাস (চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতক) এর এই স্মরণীয় উক্তি, আল-কুরআন এর উল্লিখিত বাণীরই প্রতিধ্বনি। বিদ্রোহী কবি, মরূকবি কাজী নজরুল ইসলামও ধর্ম, জাতি, গোত্রের চেয়ে মানুষই যে সর্বশ্রেষ্ঠ সে কথা আরো জোরালোভাবে বলেছেন তাঁর সাম্যবাদী কাব্যে ও ‘মানুষ’ কবিতায়ঃ
“গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।” (আবদুল কাদির সম্পাদিত, নজরুল রচনাবলী, প্রথমখন্ড, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬, পৃ.২৩৪)

বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বিভক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ে। তাদের মধ্যে বিরোধ, বৈরীতা ও রক্তপাতও দৃশ্যমান হয়েছে ইতিহাসের পথ পরিক্রমায়। অথচ সাম্প্রদায়িকতার এ বিষয়টি ধর্মীয় নীতিমালা বা অনুশাসনে তো নেই-ই, বরঞ্চ রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবতারবাদী চেতনার সুমহান আদর্শ।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেশ হলেও, এটি বহু ধর্ম সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্র একটি বহুমাত্রিক দেশ, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানাবিধ ধর্মের মানুষ বহুদিন ধরে, কিছু বিচ্ছিন্ন অনভিপ্রেত ঘটনা ব্যতীত, একত্রে সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ আবেদন বাংলাদেশের প্রধান ধর্মসমূহে কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার ইঙ্গিত দেয়ার প্রয়াস এ ধারণাপত্রে।
ইসলাম ধর্ম
ইসলাম শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে ‘সাল্ম’ থেকে। ‘সাল্ম’ অর্থ শান্তি। আল্-কুরআন ও মহানবী (সাঃ) প্রচারিত ধর্মকে বলা হয় ইসলাম। ইসলাম বলতে বুঝায় শান্তির পথে অনুপ্রবেশ, আর এর অনুসারী মুসলিম বলতে বোঝায় আল্লাহর ও মানবাত্মার সাথে শান্তি স্থাপন। মুসলিম হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসলাম পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও প্রেরিত পুরুষ এবং তাদের নির্দেশিত ধর্মসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন। (আল-কুরআন ২ঃ৪)
পবিত্র কুরআন সমগ্র মানব জাতিকে একই পরিবারের অন্তর্র্ভক্ত হিসেবে ঘোষণা করে সকল মানুষের মধ্যে সাম্য ও ঐক্যের ধারণা দিয়েছে। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের উৎস এক ও অভিন্ন। আল-কুরআন বলে, “হে মানবজাতি” তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন, তার থেকেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং দু’জন থেকে বহু সংখ্যক নারী ও পুরুষ বিস্তার ঘটিয়েছেন।” (আল্-কুরাআন ৪ঃ১)।
বস্তুতঃ অভিন্ন উৎস থেকেই মানুষ বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, গোত্র ও দলে বিভক্ত হয়েছে। কেন মানুষকে বিভিন্ন গোত্রে ও জাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে সে বিষয়টি পবিত্র কুরআন খোলাশা করে বলেছে এভাবে, “হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে, এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পার।” (সূরা হুজুরাত ৪৯ঃ১৩)। পরস্পরের সাথে পরিচিত হওয়া সদ্ভাব সম্প্রীতির প্রকৃষ্ট উপায়।
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত যে সবচেয়ে খোদাভীরু” পবিত্র কুরআনের (৪৯ঃ১৩)। এই মহৎ বক্তব্যেও সমর্থনে মহানবী (দঃ) মানুষের মধ্যে সাম্য ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে বিদায় হজ্জেও ভাষণে ঘোষনা করেছেনঃ “তোমরা সকলে ভাই ভাই এবং সকলেই সমান। তোমাদের কেই অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারনা। একজন আরব একজন অনারবের উপর এবং একজন অনারব একজন আরবের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। অনুরূপভাবে একজন শ্বেতাঙ্গ একজন কৃষ্ণাঙ্গের উপর এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ একজন শ্বেতাঙ্গের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। কেবল ন্যায়পরায়নতার ভিত্তিতে প্রাধান্য প্রাপ্তি ব্যতীত”। (গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.৩৪০)।

এভাবে ইসলাম জাতি, ধর্ম ও বর্ণের আভিজাত্য, ধনেশ্বর্যের অহংকার, পদমর্যদা ও জ্ঞান গরিমার আস্ফালনকে চুরামান করে সকল মানুষকে সাম্যের শিকলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, ‘ইসলামের বিশ্বজনীন মানবাতবোধঃ সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব,’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৭০-৭২, ফেব্র“য়ারী, ২০০২, পৃ.১৪১)।

পবিত্র কুরআন যে বারবার ‘হে মানব জাতি’ এবং ‘হে আদম সন্তানেরা’ বলে সম্বোধন করে থাকে সেটা এজন্য করে থাকে, যাতে মানুষের মনে মানবীয় ঐক্যের ধারণা সৃষ্টি ও তা বদ্ধমূল হয়ে যায়। অনুরূপভাবে ‘হে ঈমানদারগণ’ এবং ‘হে মুমিনগণ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে যাতে তাদের ভেতরে বংশীয় বা শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টির অবকাশ না থাকে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৪১)।

মানবপ্রেম, বিদ্বেষহীন আচরণ, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির আদর্শই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা। “নিশ্চয়ই মানবজাতি একখন্ড সমাজ” পবিত্র কুরআনের (২:২১৩) এই উদাত্ত ঘোষনার ব্যাখায় বিদায় হজ্বের ভাষণে সমাজের মানুষের প্রতি ভালবাসা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে মহানবী (দঃ) বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহরই পরিবার। যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তবে মানবজাতিকে ভালবাস। যদি সেই প্রভুর (আল্লাহর) সামনে যেতে চাও, তবে তাঁর সৃষ্টজীবকে ভালবাস: যা তোমরা নিজের জন্য পছন্দ কর তাদের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য বর্জন কর, তাদের জন্য তাই বর্জন করবে। তুমি তাদের প্রতি সেই ব্যবহার কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর। তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করোনা, পরস্পর হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না, তোমরা আল্লাহর দাস ও পরস্পর পরস্পরের ভাই হয়ে যাও”। (সৈয়দ বদরুদ্দোজা, হযরত মুহাম্মদ (দঃ): তাহার শিক্ষা ও অবদান ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ.৪৯-৫০, উদ্ধৃতি, মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, প্রগুক্ত, পৃ.১৪২)। বস্তুত: ইসলাম সমগ্র পৃথিবীবাসী, মানুষ, প্রাণী ও জীব জগতের প্রতি সার্বজনীন ভালবাসা ও দয়ার আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) বলেছেন, “যারা দয়া করে দয়াময় আল্লাহ্ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন”। (তিরমিযি ও আবু দাউদ, উদ্ধতি: দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ২০০০ পৃ. ৩৮)।
সার্বজনীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায় মোহাজের (মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকারী) ও আনসার (মদিনাবাসী)-এর মধ্যে ‘ভাই’ সম্বন্ধ স্থাপনের মধ্যে। মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতাব্দীর বিবাদ ভুলিয়ে মহানবী (দঃ) তাদের সাধারণ নাম দিয়েছেন আনসার (সাহায্যকারী)। বস্তুত: ঐতিহাসিক মদিনা সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গবফরহধ)-এর ভিত্তিতে মহানবী (দঃ) এর নেতৃত্বে মদিনা আদর্শ রাষ্ট্র গঠন হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনা তথা মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর সমাগত অপরাধীদের প্রতি মহানবীর (দঃ) ঘোষণা, “তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও তোমরা মুক্ত -ক্ষমা, মহানুভবতা ও মানবিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একইভাবে সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী সেন্টক্যাথেরিন মঠের সাধু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে মহানবী (দঃ) তাদের জীবন, ধর্ম ও সম্পত্তি রক্ষার যে সনদ প্রদান করেন, তা নিজ ধর্মের রাজাদের কাছ থেকেও তারা কখনো পাননি বলে ইতিহাসে প্রমান মেলে। (সৈয়দ আমির আলী, দি স্পিরিট অব ইসলাম [বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মদ দরবেশ আলী খান] ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.১২৮)।
মহানবী (দঃ) বলতেন, “যে ব্যক্তি জিম্মির (ঢ়ৎড়ঃবপঃবফ হড়হ-গঁংষরসং) প্রতি অন্যায় ব্যবহার করবে এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তার উপর চাপিয়ে দিবে আমি পরকালে তার জন্য অভিযোগকারী হবো”। (মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ইসলাম প্রসঙ্গ, রেনেসার্স প্রিন্টার্স, ঢাকা ১৯৬৩, পৃ.৭২)। বস্তুত: সহনশীলতা হলো সেই গুন যা ইসলাম ধারণ করে উদার ও মানবিক গুনে অনন্য সাধারণ। এতদবিষয়ে ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরবং- যথার্থই বলা হয়েছে, “ঞযব ৎবপড়মহরঃরড়হ ড়ভ ৎরাধষ ৎবষরমরড়ঁং ংুংঃবসং ধং ঢ়ড়ংংবংংরহম ফরারহব ৎবাবষধঃরড়হ মধাব ঃড় ওংষধস ভৎড়স ঃযব ড়ঁঃংবঃ ধ ঃযবড়ষড়মরপধষ নধংরং ভড়ৎ ঃযব ঃড়ষবৎধঃরড়হ ড়ভ হড়হ গঁংষরসং” অর্থাৎ ‘প্রতিদ্বন্দি বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক উৎসের স্বীকৃতি দেয়ার শুরু থেকেই ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি সহনশীলতার ধর্মতাত্বিক ভিত্তি লাভ করেছে’।
বস্তুত: ‘লা এক্রাহা ফিদ্ দ্বীন’ (ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই) এবং ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়াদ্বীন’ (তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য) পবিত্র কুরআন-এর এই অমোঘ বাণী বিশ্বের অন্যান্য ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়া ও মেনে নেয়ার এক সুস্পষ্ট চুড়ান্ত নির্দেশ।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-এর আদর্শ ধারণ করেই মুসলিমরা বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, খুব কম সময়ে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমৃদ্ধ, উদার, মানবতবাদী চেতনার সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মানে সক্ষম হয়েছিল। ইসলাম শিক্ষা বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আব্দুর রশিদ যথার্থই বলেন যে, ‘সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের গুনেই বিশ্বমানবের কল্যান সাধন করা, বিশ্বশান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্ব বন্ধুত্ব স্থাপন করা তাদের (মুসলিমদের) পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। যে রাষ্ট্রে বা সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এই আদর্শের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়, সে রাষ্ট্র বা সমাজ মুসলিম রাষ্ট্র বা সমাজ নয়। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৫৬)।

হিন্দু ধর্ম
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় হিন্দু ধর্মের লক্ষণ সম্পর্কে বহা হয়েছে:
“অহিংসা সত্যমস্তেয়ং শৌচং সংযমমেব চ
এতৎ সামাসিকং প্রোক্তং ধর্মস্য পঞ্চলক্ষণম্ ॥”
অর্থাৎ হিংসা না করা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, শুচি থাকা এবং সত্যাশ্রয়ী হওয়া-এই পাঁচটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ। অহিংসা আচরণ তখনই সম্ভব, যখন আমরা সমদর্শী হব অর্থাৎ সকল মানুষকে নিজের মতো মনে করব। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬/৩২)।
মনুসংহিতার মতে ধর্ম হচ্ছে কতগুলো গুণের সমষ্টি। উক্ত হয়েছে-
“ধৃতিঃ ক্ষা দমোহস্তেয়ং
শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো
দশকং ধর্মলক্ষণম্ ॥” (মনুসংহিতা, ৬/৯২)
অর্থাৎ সহিষ্ণুতা (ধৈর্য), ক্ষমা (ক্ষমাশীলতা), আত্ম-সংযম, চুরি না করা (পরস্ব অপহরণ না করা), শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, শুদ্ধবুদ্ধি (প্রজ্ঞা), বিদ্যা (জ্ঞান), সত্য এবং অক্রোধ (ক্রোধহীনতা) এই দশটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ।
এই দশটি গুন যিনি যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারেন তাঁর মধ্যে মানুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। এ আলোকে হিন্দুধর্ম কোন বিশেষ স্থান, কাল, জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে ধর্মাচরনের বিধান দেয় নি। সকল দেশের, সকল কালের, সকল মানুষের পক্ষে যা কল্যাণকর সেটিই হচ্ছে হিন্দুধর্মের নির্দেশনা। হিন্দুধর্ম বহু মত ও পথের সমন্বয়ে সৃষ্টি। অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী, একেশ্বরবাদী, আস্তিক, নাস্তিক, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি বিভিন্ন ধারার বিশ্বাস মত ও পথ এর ধর্মদেহে লীন হয়েছে একান্তভাবে। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন- ‘যত মত তত পথ’। ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান’-এটাই হিন্দুধর্মের মূল চেতনা। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তা এখানে স্বীকার্য। মানবিক মূল্যবোধে, মানবিক কল্যাণে যা কিছু তা এখানে গ্রহণীয়। এটা কেবল সম্ভব মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বিভিন্ন মত ও পথের প্রতি সীমাহীন সহিষ্ণুতা ও প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ থেকে। হিন্দুধর্মের এই যে ঔদার্য, বিশালতা, মানবিক বিকাশের ধারা এবং তার অন্তরের সঞ্জীবনী শক্তি তা নিঃসন্দেহে নন্দিত।
হিন্দুধর্ম বিশ্বাসে কেবল সর্বজনীন সহনশীলতাই নেই বরং এখানে একটা দৃঢ় প্রতীতি আছে যে পৃথিবীতে যদি কোনো একটি ধর্ম সত্য হয় তাহলে অন্য ধর্মগুলোও সত্য। সকল ধর্মে, সর্বকালে এবং সব দেশেই হতে পারে অবিনাশী বাণীর উচ্চারণ ও মহিমান্বিত পুরুষের আবির্ভাব। হিন্দুধর্মের মানবিক ঔদার্য্য, চিন্তার প্রসারতা, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি বিচার বিশেষণ করে একে যদি কেউ বলে ‘মানবধর্ম’ তাহলেও অত্যুক্তি হবে না।
হিন্দুধর্মের প্রধান দিক সকল জীবের মধ্যে ঈশ্বর দর্শন, সকলকে ভালোবাসাই ধর্ম- এই চেতনাটি বীর সন্ন্যাসী বিবেকান্দের ভাষায় প্রতিফলিত হয়েছে অনুপমভাবে-
“ব্রহ্ম হতে কীট-পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মনপ্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে এ সবের পায়।
বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন ও সাম্যের বাণী প্রচারই হিন্দু ধর্মে মূল লক্ষ্য। বেদ, উপনিষদ, রাময়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সহ প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই জীবের প্রতি ভালোবাসার কথা, মানবকল্যাণের কথা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাম্যের (শান্তির) বাণী প্রচারিত হয়েছে। উক্ত হয়েছে-
“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম॥
এম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ”।
(শ্রীমদ্বদ্গীতা, ৪/১১)
অর্থাৎ ‘হে পার্থ’ যে আমাকে যেভাবে উপাসনা করে, আমি তাকে যেভাবেই তুষ্ট করি। মনুষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথের অনুসরণ করে’।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী মহাপুরুষগণের ধর্মচিন্তার প্রধানভিত্তি মানবতাবাদ। তাঁরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখতেন এবং সকল ধর্মের মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসতেন। লোকনাথ ব্রক্ষচারী বলেছেন-
“ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য এসবই
জগতের ব্যবহারিক সত্য, মনের
সৃষ্টি। আমি যে জগতের লোক
সেখানে নেই কোনো ভেদ, সেখানে
সবই সমান-সবই সুন্দর”॥
অর্থাৎ ‘তোমরা সংযুক্ত হও, একবিধ বাক্য প্রয়োগ কর, তোমাদের মনসমূহ জ্ঞাত হোক সমানরূপে। তোমাদের সংকল্প সমান, তোমাদের হৃদয়সমূহ সমান এবং সমান হোক তোমাদের আন্তঃকরণসমূহ। যাতে তোমাদের পরম ঐক্য হয়, তাই হোক’।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “যুদ্ধ নয়, সহমর্মিতা; ধ্বংস নয়,সৃষ্টি; সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতি’। তিনি আরো বলেছেন ‘বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি’। বস্তুত: বিশ্বশান্তির জন্য প্রয়োজন হিন্দুধর্ম প্রস্ফুটিত মহান ঐক্য ও সম্প্রীতির বাণী মনেপ্রাণে ধারণ করে কাজ করা।
ওঁ শান্তি (ওম্ শান্তি)- এতো সকল মানুষের জন্যই শান্তি কামনা, কাউকে বাদ দিয়ে নয়। এটি হিন্দু ধর্মের সার্বজনীন সদ্ভীব ও সম্প্রীতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরন।

বৌদ্ধ ধর্ম
আজ থেকে আড়াইহাজার বছর পূর্ব জন্মালাভকারী মহামানব গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত ধর্ম বৌদ্ধধর্ম নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মানবসভ্যতায় ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবিক সাধনার এক অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত বুদ্ধজীবন। বুদ্ধের চিন্তা-চেতনা ও কর্মের মধ্যে মানবের কল্যাণ প্রকৃষ্টভাবে দেখা যায়।

বুদ্ধ লোভ-দ্বেষ-মোহ পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন। মানুষের কল্যাণ, সুখ-শান্তি, দুঃখমুক্তির কথা বলেছেন। তিনি সকল মানুষকে এক এবং অভিন্ন করে দেখতেন। তিনি ধর্মপ্রচার করার সময় তাঁর শিষ্যদেরকে উপলক্ষ্য করে বলেছিলেন; ‘হে ভিক্ষুগণ! বহুজনের সুখের জন্য, বহুজনের মঙ্গলের জন্য তোমরা দিকে দিকে বিচরণ করো, এমন ধর্ম দেশনা করো যার আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ (মহাবর্গ পৃ.২২)। বুদ্ধের এই বাণী চিরন্তন এবং চিরশ্বাশত। এখানে বুদ্ধ সকল সম্প্রদায়ের সুখ ও মঙ্গলের কথা বলেছেন। সকলের কল্যাণের কথা বলেছেন। পারস্পরিক সদ্ভাব-সম্প্রীতির কথা বলেছেন।
বুদ্ধ মানুষে মানুষে এমন কি নারী-পুরুষে ভেদাভেদ করেননি। তিনি সাম্যেও ধারণা দিয়েছেন। তাঁর ধর্মে নেই কোন জাত-অজাতের অভিমান। তিনি বলেছিলেন: গঙ্গা, যমুনা প্রভৃতি বড় বড় নদী যেমন সমুদ্রে মিলে স্বতন্ত্র সত্তা ও নাম হারিয়ে অনুরূপভাবে ব্রাক্ষন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ ভিক্ষু-সঙ্ঘে স্থান পায়। তিনি ছিলেন রাজপুত্র। তিনি ধনী-গরীব, উচু-নীচু সবাইকে ভালোবাসতেন। শুধু তাই নয়, সকলকে তাঁর ধর্মে অংশ গ্রহন করারও সুযোগ করে দিতেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্যে শান্তিময় জীবনযাপন প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন: ‘বৈরীদের মধ্যে বৈরীহীন হয়ে, হিংসাকারীদের মধ্যে অহিংস হয়ে সুখে জীবনযাপন করো’। (ধর্মদপ/গাথা সংখ্যা,১৯৭)। মৌমাছি যেমন ফুলের বর্ণগন্ধ ও আকৃতি বিনষ্ট না করে শুধু মধু আহরণ করে, তেমনি মানুষকেও সমাজে কারো ক্ষতি বা অনিষ্ট না করে শুদ্ধভাবে জীবনযাপন করা উচিত। তিনি আরো বলেন: ‘খারাপ চরিত্র সম্পন্ন ব্যাক্তির নিন্দা ও অকীর্তি প্রচার হয়। গুণী, পন্ডিত, বিনয়ী ব্যাক্তির প্রশংসা ও গুণকীর্তি অর্জন লাভ করে’ (থের গাথা, পৃ.৩৬২)। এখানে তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সলকে উপলক্ষ্য করেই এই উপদেশ প্রদান করেছিলেন।
সংযমের মাধ্যমে পরিচালিত চিত্তই সবাইকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন; ‘বৈরী বৈরীর বা শত্র“র শত্র“র যে অনিষ্ট সাধন করে, বিপথে পরিচালিত চিত্ত তাঁর চেয়ে অধিক অনিষ্টকারী হয়’ (ধর্মপদ, গাথা সংখ্যা ৪২)। এখানে চিত্ত সংযমের কথা বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে সকল প্রকার সম্প্রীতি-সদ্ভাব বিনষ্ট হওয়ার পেছনে এই মন বা চিত্তই প্রধান ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বুদ্ধ, মনকে সংযত করার কথা বলেছেন।

বিশ্বে কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় বৌদ্ধধর্ম তার নির্দেশনা রয়েছে। শুধু মানুষ নয়, যে কোনো প্রাণীর প্রতি হিংসা করা ও পাপ। বুদ্ধবাণীর মূল কথা হলো অহিংসা, সর্বজনীন শান্তি, মৈত্রী, পরমতসহিষ্ণুতা, উদারতা। এই উপদেশগুলো সর্বকালের এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য।
লোভ-দ্বেষ-মোহের কারণে মানুষ মানসিক এবং শারীরিক অশান্তি, দুঃখ, যন্ত্রণা পায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধের ‘অহিংসা পরম ধম্ম’ ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। শান্তি বিনষ্টকারী সকল প্রকার প্রচেষ্টা ও কার্যকলাপ বৌদ্ধধর্মে নিশিদ্ধ। বুদ্ধের নিষিদ্ধ পঞ্চ বানিজ্যেও মধ্যে মদ, বিষ, মৎস, প্রাণী এবং অস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:
সব্বে তসন্তি দন্ডস্স সব্বেসং জীবিতং পিয়ং
অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয়্য ন ঘাতয়ে। (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা, ১২৯)
অথাৎ, ‘সকলেই দন্ডকে ভয় পায়। কেননা, জীবন সকলের প্রিয়। নিজের সাথে তুলনা করে কাউকে আঘাত বা হত্যা করবে না’। বুদ্ধ অস্ত্র বা শক্তির জয় অপেক্ষা আত্মজয়কে শ্রেষ্ঠ জয় বলেছেন। তিনি বলেন: ‘যিনি যুদ্ধে হাজার বার হাজারো মানুষকে জয় করেন তার সেই জয় অপেক্ষা যিনি একমাত্র নিজেকে জয় করেছেন তিনিই শ্রেষ্ঠ বিজয়ী’। বুদ্ধ আরো বলেন: ‘অক্রোধের দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, সাধুতা দ্বারা অসাধুকে জয় করবে, সত্যের দ্বারা মিথ্যাকে জয় করবে, ত্যাগ দ্বারা কৃপণকে জয় করবে’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/৫)। বুদ্ধের অন্যতম শিক্ষা হলো ‘জগতে শত্র“তার দ্বারা শত্র“তার কখনো প্রশমিত হয় না। শত্র“তাহীনতার দ্বারাই শত্র“তা উপশম হয়’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/২২৩)।

সুত্র নিপাত নামক গ্রন্থের ‘মৈত্রী সূত্রে’ উক্ত হয়েছে: ‘কেউ কাকেও বঞ্চনা করবে না। ছোট-বড়, উত্তম-অধম বলে কাকে অবজ্ঞা করবে না, ক্রোধ বা হিংসা করবে না, কেউ কারো দুঃখ কামনা করবে না। মা যেমন নিজের জীবনের বিনিময়ে তার একমাত্র সন্তানকে রক্ষা করেন তদ্রুপ সকল প্রাণির প্রতি অপরিমেয় মৈত্রী পোষণ করবে’ (পৃ.৩৬)। আদর্শ সমাজ, পরিবার, উন্নত জীবনগঠন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিশ্বশান্তি ও ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ়করণে বুদ্ধবাণী অপরিহার্য।

সব্বে সত্তা সখিতা অর্থাৎ: ‘সকলের মঙ্গল হোক, কল্যাণ হোক’। বুদ্ধের এই অমোঘ বাণী সকল সম্প্রদায়ের, সকল মানুষের জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক অসাধারণ বাণী।

খ্রিস্টধর্ম
পবিত্র বাইবেল ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে মানুষের আচরণের প্রধান চালিকাশক্তি হলো ধর্ম। প্রকৃত ধর্মের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে মানুষের কর্মে, অপর মানুষের প্রতি তার আচরণে। ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য সৃষ্ট হয়নি। বাইবেলে প্রবক্তা মীমা প্রকৃত ধর্মের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “ ঞড় ধপঃ লঁংঃষু, ষড়াব ঃবহফবৎষু ধহফ ধিষশ যঁসনষু নবভড়ৎব এড়ফ.” অর্থাৎ ধর্ম হলো ‘ন্যায় সঙ্গতভাবে কাজ করা, কোমল হৃদয়ে ভালবাসা এবং বিনম্রচিত্তে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে যাওয়া’।

বাইবেলের আদি পুস্তকে মানব পরিবারের যাত্রা শুরুর কথা বলা হয়েছে: ‘ঈশ্বর তাঁর মূর্তিতে আপন ‘সাদৃশ্যে’ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের পুরুষ ও নারী করেই সৃষ্টি করলেন। ঈশ্বর মানুষকে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমরা প্রজাবন্ত হও ও বংশ বৃদ্ধি কর”। (আদিপুস্তক ১:২৬-২৭)। এভাবে পরিবার মিলন, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনে একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ বিনির্মিত হয়েছে।
খ্রিস্টধর্ম মতে, জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেহেতু মানুষ, সবার জীবনের উৎস যেহেতু এক ও অভিন্ন সকলের সৃষ্টিকর্তাও যেহেতু মাত্র একজন, তাই সকল মানুষই এক মানব পরিবারের সদস্য-সদস্যা। বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিষ্ঠাতা কোন নিদিষ্ট জনগোষ্টিার নয়, অধিপত্যবাদেও স্থান ধর্মে নেই। রয়েছে সার্বজননীনতা।

‘নতুন বিশ্ব’ বাইবেলের ভাষায় নতুন স্বর্গ ও নতুন পৃথিবী, যেখানে ‘মানুষেদের মাঝখানে পরমেশ্বরের আবাস। তিনি তাদের সঙ্গে বসবাস করবেন; তারা হবে তাঁর আপন জাতি। স্বয়ং পরমেশ্বর তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবেন; তিনি হবেন তাদের আপন ঈশ্বর, তাদের চোখ থেকে মুছিয়ে দেবেন সমস্ত অশ্র“জল। তখন মৃত্যু আর থাকবে না, থাকবেনা আর শোক, আর্তনাদ, দুঃখ যন্ত্রণা’ (প্রত্যাদেশ ২১, ৩খ-৪ক)
বাইবেলে বর্ণিত ঐশি বিষয়াবলি বিশ্লেষণ করে ১৯৬৫-এ দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভায় (ঠধঃরপধহ ঈড়ঁহপরষ ১১) ‘অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর (ঈযঁৎপয) সম্পর্ক বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ -এ বলা হয় যে, ‘সব মানুষ মিলেমিশে একটি সমাজ গঠিত হয়, কারণ সব মানুষ এসেছে একই উৎসমূল থেকে যা ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন সারা পৃথিবীটাকে মানুষের বাসভূমি করার জন্য। সব মানুষ একই গন্তব্যের দিকে তথা ঈশ্বরের দিকে ধাবিত। ঈশ্বরের তত্ত্বাবধান, তার সুস্পষ্ট উত্তমতা ও ত্রাণমূলক পরিকল্পনা সকল মানুষের জন্য পরিব্যপ্ত; সকল মানুষ পূণ্য নগরীতেই একত্রিত হবে’। এ আলোকে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়কে স্বীকার করে এ-ঘোষণায় বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিরাজমান অন্যান্য ধর্ম নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক বিধান ও পূর্জা অর্চনার মাধ্যমে জীবন যাত্রার সুবিন্যস্ত প্রণালী উদ্ভাবন করে নিজ নিজ উপায়ে চেষ্টা করে থাকে মানব হৃদয়কে শান্ত করার জন্য। মানুষে মানুষে, এমনকি জাতিতে জাতিতে একতা ও ভালবাসা লালন করার জন্য খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কী কী বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করা যায় তার প্রতি গুরুত্বরোপ করা হয়। সবশেষে সকল খ্রিস্টভক্তদের প্রতি আহবান জানানো হয় যেন তারা তাদের বিশ্বাস ও জীনবযাত্রার সাক্ষ্য দিতে দিতে অখ্রিস্টানদের মধ্যে বিরাজমান আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্যগুলো এবং তাদের সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতি যেন স্বীকার, সংরক্ষণ ও উৎসাহিত করেন।

ভালবাসা খ্রিস্ট ধর্মমতের এক মৌলিক শিক্ষা। ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এতই নির্ভরশীল যে, পবিত্র শাস্ত্র বলে, “যে ভালবাসেনা, সে পরমেশ্বরকে মানে না”। পূণ্য প্রেরিত পিতর ও পলের অনুসরণ করে ভাতিকান সহাসভা খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসীদের অনুরোধ জানায় যেন বিধর্মীদের প্রতি তারা সদাচরণ করে চলেন এবং নিজেদের পক্ষ থেকে সব মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করে স্বর্গীয় পিতার সত্যিকার সন্তান হয়ে উঠেন। (দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভা “অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর সম্পর্ক বিষয়েক ঘোষণাপত্র”, ২৮ অক্টোবর, ১৯৬৫)।
প্রয়াত পোপ দ্বিতীয় জন পল-এর ভাষায়, “চবধপব ফবসধহফ ধ সবহঃধষরঃু ধহফ ধ ংঢ়রৎরঃ যিরপয নবভড়ৎব ঃঁৎহরহম ঃড় ড়ঃযবৎং, সঁংঃ ঢ়বৎসবধঃব যরস যিড় রিংযবং ঃড় নৎরহম ঢ়বধপব. চবধপব রং ভরৎংঃ ধহফ ভড়ৎবসড়ংঃ ঢ়বৎংড়হধষ, নবভড়ৎব রঃ রং ংড়পরধষ. অহফ রঃ রং ঢ়ৎবপরংবষু ঃযরং ংঢ়রৎরঃ ড়ভ ঢ়বধপব যিরপয রঃ রং ঃযব ফঁঃু ড়ভ বাবৎু ঃৎঁহ ভড়ষষড়বিৎ ড়ভ ঈযৎরংঃ ঃড় পঁষঃরাধঃব”. এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ এর ৩-৪ জুলাই ‘মুসলমান-ক্যাথলিক যোগাযোগ কমিশন’ – এর উদ্যোগে ‘বিশ্বায়ন যুগে ধর্ম ও সভ্যতার সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনায় পরিসমাপ্তিতে এক যুক্ত ইশতিহারে বিশ্বায়নের গুরুত্ব ও শুভফল স্বীকার করে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয় কতিপয় ভয়ঙ্কর দিকের কথা ‘যা সর্বজন স্বীকৃত ও ন্যায্য নীতিমালা প্রণয়নে, ধর্মরে প্রতি সম্মান এবং মানুষের কৃষ্টিগত মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সাথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে’। পরিশেষে মুসলমান ও ক্যাথলিক যৌথ কমিশন একমত হয়ে বলেছেন যে, সংলাপের কৃষ্টি গড়া, ভোগবাদের প্রতিরোধ করা উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সকল প্রকার বৈষম্য বর্জন করার জন্য তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।

উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশের তথা বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিটির মৌলিক দর্শন এক ও অভিন্ন। আর তা হলো অহিংসা, ভালবাসা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধারণা। মানবজাতি এখানে মূল উপজীব্য। মানব প্রেম ও মানব কল্যান সাধন সকল ধর্মের মূল-শিক্ষা। মানবতাবাদী চেতনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনেই ধর্মের সাফল্য নিহিত। ভারতবর্ষে এ আদর্শের ব্যতায় অবলোকন করে বিশ শতকের ত্রিশের দশকে হিন্দু মুসলমান প্রবন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন: “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাধনে তাকে বাঁধতে পারেনা, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটিকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে, রাষ্ট্রিক স্বার্থবৃদ্ধি কি সে দেশকে বাঁচাতে পারে?’ (‘হিন্দু মুসলমান ২’, কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী, (স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সম্পাদিত), দ্বাদশ খন্ড, ঐতিহ্য সংস্করণ, জানুয়ারী ২০০৪, পৃ.৭০৬)।
বস্তুত: হোমো, স্যাপিয়েন্স লিন (ঐড়সড় ংধঢ়রবহং খ) পরিবারের সদস্য হিসেবে মানবতাবাদী চেতনার সূত্রে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখাই হলো সকল ধর্মের মূল শিক্ষা।

Posted in Uncategorized | Comments Off on ধর্মে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিঃ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা ডক্টর ম. আখতারুজ্জামান- অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ত্যাগ ও অর্জনের মহিমায় মহিমান্বিত মহররম- অধ্যাপিকা হাফিজা ইসলাম।

ত্যাগ ও অর্জনের মহিমায় মহিমান্বিত মহররম- অধ্যাপিকা হাফিজা ইসলাম।

‘নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া
আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া গুনিয়া।’
বর্ষ পরিক্রমায় আবারও ফিরে এল ১০ মহররম, আশুরা। হিজরি নববর্ষের ১০ মহররম আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর দ্বীন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য, ইসলামী আদর্শের খাতিরে, এর পতাকাকে সমুন্নত রাখার মানসে, মহানবী (সা.)-এর আদর্শের মর্যাদা রক্ষাকল্পে, সর্বোপরি ন্যায় ও সত্যের মানদণ্ড অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে নবী করিম (সা.)-এর অতি আদরের দৌহিত্র, মা ফাতিমা (রা.)-এর নয়নমণি, হজরত আলী (রা.)-এর আদরের দুলাল হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালার ঐতিহাসিক রণাঙ্গনে পুত্র-পরিজনসহ শাহাদাতবরণ করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক ঘটনারূপে অঙ্কিত হয়ে আছে।
ন্যায় ও সত্যের অন্বেষায় পরিচালিত যুদ্ধকেই ইসলামী পরিভাষায় জিহাদ বলা হয়। আর জিহাদে যাঁরা আ@ে@@@াৎসর্গ করেন, তাঁরাই শহীদ। শহীদের মরণ নেই। তাঁরা অমর। এ প্রসঙ্গে পাক কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর রাহে জিহাদ করে প্রাণ উৎসর্গ করে, তাদের তোমরা মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত-চিরঞ্জীব’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৪; আল এমরান, আয়াত ১৬৯)।
ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যুগে যুগে বহু মনীষী জিহাদে অংশ নিয়েছেন, পরিচালনা করেছেন এবং শাহাদাতবরণ করেছেন। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) সত্যের প্রতিষ্ঠা আর অসত্যকে নির্মূল করার জন্য যেসব জিহাদ পরিচালনা করেছেন, তার মধ্যে হিজরি দ্বিতীয় সনে বদরের যুদ্ধ, হিজরি তৃতীয় সনে ওহুদের যুদ্ধ, হিজরি চতুর্থ সনে বনি মোস্তালিকের যুদ্ধ, হিজরি পঞ্চম সনে খন্দকের যুদ্ধ, হিজরি ষষ্ঠ সনে হুদায়বিয়ার সন্ধি, হিজরি সপ্তম সনে খাইবারের যুদ্ধ এবং হিজরি অষ্টম সনে মক্কা বিজয়। এই মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়েই অন্যায়-অসত্যের অন্ধকার ভেদ করে সত্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কারবালার ময়দানের যে ঘটনা তা হচ্ছে, ন্যায়-সত্যের ওপর আঘাত তথা ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা নবী করিম (সা.) যে ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, তার মূলে প্রথম কুঠারাঘাত করেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের পর গদিনশিন আমির মুয়াবিয়া (রা.)। তিনি ইসলামী খেলাফতের বিধিবিধান লঙ্ঘন করে রাজতন্ত্র ও জৌলুশপূর্ণ রাজদরবারের বীজ বপন করলেন। এটুকু করেই ক্ষান্ত হলেন না; বরং রাজতন্ত্রের চিরাচরিত নিয়ম অনুসারে বংশানুক্রমিক রাজবংশ কায়েমের লক্ষ্যে সম্পূর্ণ অনৈসলামিক পন্থায় তদীয় পুত্র ইয়াজিদকে রাষ্ট্রের শাসনভার অর্পণ করলেন।
নবী করিম (সা.)-এর দৌহিত্র, বীরত্ব ও সৎ সাহসের প্রতীক, রাসুল (সা.)-এর আদর্শকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে যিনি পরে জীবন উৎসর্গ করেন সেই ইমাম হুসাইন (রা.) মুয়াবিয়ার এরূপ অনৈতিক ও অন্যায় কাজকে বরদাশত করতে পারেননি। এতেই উপ্ত ছিল কারবালার মর্মন্তুদ কাহিনীর বীজ। ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করে, বংশানুক্রমিক রাজস্ব কায়েমের উদ্দেশ্যে ইয়াজিদ ইমাম হুসাইন (রা.)-কে তার প্রতি আনুগত্য গ্রহণের নির্দেশ দেয়, অন্যথায় তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়। এ অবস্থায় ইমাম হুসাইন (রা.) পরিবার-পরিজনসহ মক্কায় হিজরত করেন। এ দুঃসময়ে কুফাবাসীর পুনঃ পুনঃ আমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করেন এবং স্বজনসহ ৩২ জন অশ্বারোহী এবং ৪০ জন পদাতিক বাহিনী নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে ইয়াজিদ বাহিনী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফোরাত নদীর উপকূলে কারবালা প্রান্তরে যাত্রাবিরতি করতে বাধ্য হন। নিরস্ত্র ৭২ জনের ওপর সশস্ত্র পাঁচ হাজার ইয়াজিদ বাহিনীর চরম আক্রমণ শুরু হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে অসত্য ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জিহাদে নিরস্ত্র স্বজন-পরিজনরা একে একে শাহাদাতবরণ করেন। তথাপি অকুতোভয় ইমাম হুসাইন (রা.) মাথা নত করলেন না। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর সন্তান-সন্ততিসহ নিজের তাজা রক্ত উৎসর্গ করে ইসলামের ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখলেন।
সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী নবী করিম (সা.)-এর স্নেহধন্য হজরত ইমাম হুসাইনের শাহাদাতবরণের শোকাবহ ঘটনার ধারক-বাহক হিসেবে ১০ মহররম ইসলামের ইতিহাসে ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। মহররমের ১০ তারিখ একদিকে যেমন ত্যাগের মহিমায় মহিমাণ্ডিত, অন্যদিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে এই দিনে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বা হবে, তা বুকে ধারণ করে এ দিবসটি অপার গৌরবে গরীয়ান হয়ে আছে।

Posted in Uncategorized | Comments Off on ত্যাগ ও অর্জনের মহিমায় মহিমান্বিত মহররম- অধ্যাপিকা হাফিজা ইসলাম।

রাসূল প্রেম ব্যতিত আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও বিশ্ব শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়- সৈয়দ সাাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী।

রাসূল প্রেম ব্যতিত আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও বিশ্ব শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়- সৈয়দ সাাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী।

আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়া গোড়ান-ঢাকা শাখার উদ্যোগে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১২ শুক্রবার রাজধানী ঢাকার গোড়ানে আলী আহমদ হাইস্কুল মাঠে বাদ এশা মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম ফটিকছড়ি মাইজভান্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন,আন্জুমান কেন্দ্রীয় সভাপতি রাহনুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরীক্বত হযরতুল্হাজ্ব মাওলানা সৈয়দ সাাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী ওয়াল হোসাইনী মাইজভান্ডারী (ম.জি.আ.)।

তিনি বলেন- রাসূল প্রেম ব্যতিত আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও বিশ্ব শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়। আর প্রিয় মুরর্শিদ হযরত সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী (ক.) বিশ্ববাসীকে সেই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় আজ কিছু জ্ঞান পাপী ও বিকৃত মতাদর্শী লোক ইচ্ছাকৃত ভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবমাননার দৃষ্টতা দেখাচ্ছে। অথচ সকল যুগের জ্ঞানী মনীষীরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক বাক্যে সর্বকালের সর্বোত্তম ব্যক্তিত্ব ও মহামানব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবমাননা করে আমেরিকায় চলচ্চিত্র নির্মাণ ও ফ্রান্সে পত্রিকায় কার্টন ছাপানোর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জাতিসংঘ, আরবলীগ, ও.আই.সি সহ অন্যান্য বিশ্বসংস্থা সমূহকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহব্বান জানান।

মাহফিলে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, খলিফায়ে গাউছুল আ’যম মাওলানা নূরুল ইসলাম জামালপুরী, মুফতী বাকী বিল্লাহ আযহারী, মাওলানা রুহুল আমিন ভূঁইয়া,মাওলানা শেখ সাদী আবদুলÍাহ , ফকরুল আহমদ, রুহুল আমিন,জোবায়ের আহমদ মারুফ মাইজভান্ডারী প্রমুখ সহ আন্জুমান বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মাইজভান্ডারী আশেক ভক্তসহ সুন্নী জনতার উপস্থিতি ছিল লক্ষনীয়।

পরে মুসলিম উম্মাহ ও সর্বমানবতার কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন আল্লামা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী (ম.জি.আ.)।

Posted in Uncategorized | Comments Off on রাসূল প্রেম ব্যতিত আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও বিশ্ব শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়- সৈয়দ সাাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী।

মহানবী (দঃ) এর আগমন সমগ্র সৃষ্টির জন্য নেয়ামতে আকবর- মহানবী (দঃ) এর আগমন সমগ্র সৃষ্টির জন্য নেয়ামতে আকবর- সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী

মহানবী (দঃ) এর আগমন সমগ্র সৃষ্টির জন্য নেয়ামতে আকবর-
সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী
২৫ জানুয়ারী ২০১৩ শুক্রবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন রমনা ঢাকা মিলনায়তনে পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) উপলক্ষ্যে আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার ব্যবস্থাপনায় মাইজভান্ডার দরবার শরীফের বর্তমান ইমাম ও সাজ্জাদানশীন দরবার -এ গাউছূল আজম মাইজভান্ডারী হযরতুলহাজ্ব শাহসূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী ওয়াল্ হোসাইনী মাইজভান্ডারী (মাঃজিঃআঃ) এর সভাপতিত্বে ও নেতৃত্বে এক আলোচনা সভা ও বর্ণাঢ্য জশ্নে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়।

এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় তথ্য মন্ত্রী জনাব হাসানুল হক ইনু। সম্মানিত মেহমান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট মোঃ শাহজাহান মিয়া, বিরোধী দলীয় চীফ হুইফ জনাব জয়নাল আবেদীন ফারুক(এম পি) সহ দেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আন্জুমানের সকল স্তরের সদস্য ও আশেকানবৃন্দ।

সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী ওয়াল্ হোসাইনী মাইজভান্ডারী তাঁর বক্তব্যে বলেন- মহিমাময় মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া যিনি আমাদের জন্য নেয়ামতে আকবর স্বরুপ তাঁর প্রিয় হাবিবে কিবরিয়া, নূরে মূজাচ্ছাম, শাফীউল মুজনেবীন, রাহমাতাল্লি¬ল আলামীন, সাইয়্যেদুল আস্বিয়া হুজুরপুরনূর আহমদে মুজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) কে পৃথিবীতে পাঠিয়ে সমস্ত সৃষ্টি জগতকে ধন্য করেছেন। আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের এক উত্তম উছিলা হিসাবে সমগ্র বিশ্ববাসীর উচিত হুজুর করিম (দঃ) এর এই বেলাদত দিবস উপলক্ষ্যে আজিমুশ্বান অনুষ্ঠান পালন করা। পবিত্র কোরআনুল হাকিম-এ আল্লাহ পাক প্রিয় নবী (দঃ) সহ অন্যান্য নবী রাসুলদের মিলাদনামা প্রকাশ করেছেন এবং জন্মের আলোচনা ও শুকরিয়ার আনন্দ প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথি ও বিশেষ মেহমানগন আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন- পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) উপলক্ষ্যে বিশাল সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য জশ্নে জুলুসের আয়োজন রাসূলে পাকের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। এ দিবসের একটি স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য ও মাহত্ব রয়েছে এবং রবিউল আউয়াল মাসের এই দিনটি বহু সম্মানিত ও তাৎপর্যপূর্ন। আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. এম এম নিয়াজী, মুফতী মাওলানা নুরুল ইসলাম জামালপুরী, মাওলানা রুহুল আমিন ভুইয়া প্রমুখ। আলোচনা শেষে সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারীর নেতৃত্বে জশ্নে জুলুস (আনন্দ শোভাযাত্রা) রাজধানীর প্রেসক্লাব, পল্টন, কাকরাইল, মৎস ভবন হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন শেষে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এসে বিশ্ব উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, শান্তি, মানবতার কল্যান এবং দেশের অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও তবারক বিতরনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

Posted in Uncategorized | Comments Off on মহানবী (দঃ) এর আগমন সমগ্র সৃষ্টির জন্য নেয়ামতে আকবর- মহানবী (দঃ) এর আগমন সমগ্র সৃষ্টির জন্য নেয়ামতে আকবর- সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী

মহানবী (দ.), ইসলাম ও কোরআন অবমাননাকারী ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ঠকারীরা সমগ্র মানবতার শত্র“। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে-

মহানবী (দ.), ইসলাম ও কোরআন অবমাননাকারী ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ঠকারীরা সমগ্র
মানবতার শত্র“। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে-
-সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী মাইজভান্ডারী (ম.জি.আ)।

৭ অক্টোবর-১২ রবিবার “আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়া”র উদ্যোগে হাজার-হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ আমেরিকায়-ফ্রান্সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম ও ইসলামকে অবমাননা করে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও ব্যঙ্গ চিত্র প্রকাশের প্রতিবাদ এবং রামু-উখিয়া-পটিয়ায় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে।

চট্টগ্রাম মাইজভান্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন ও “আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়া”র সভাপতি শাহ্সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী মাইজভান্ডারী (ম.জি.আ) এতে নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে একটি মডেল। হাজার বৎসর ধরে এখানে সকল ধর্ম বিশ্বাসীরা শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছে। কক্সবাজার রামু-উখিয়া ও পটিয়ার বৌদ্ধ- হিন্দু মন্দিরে যারা নৃশংস হামলা করেছে তারা কেউ মুসলমান নন, তাদের বড় পরিচয় তারা দুর্বৃত্ত, মানবতার দুশমন। তিনি বলেন এ ইস্যুকে রাজনীতির রূপ না দিয়ে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখতে এবং জাতীয় স্বার্থে সরকার -বিরোধী দলকে ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে হবে। সকলে মিলে অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, মাইজভান্ডারী মহাত্মারাসহ আউলিয়া কেরামের আদর্শই হচ্ছে মানুষে-মানুষে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে সবাই বসবাস করা আর এটাই হচ্ছে অলীগণের শিক্ষা। তিনি হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি ও সংঘাতময় আবহ থেকে পরিত্রাণ পেতে আউলিয়ায়ে কেরামের শান্তি-সাম্প্রীতির নীতিতে সকলকে উজ্জীবিত হবার আহবান জানান । সংখ্যালঘুদের জান মালের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের পাশাপাশি সবার নৈতিক দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইসলাম, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম ও কুরআনের অবমাননা এবং ধর্ম নিন্দা বন্ধে জাতিসংঘ, আরবলীগ ও ও.আই.সিকে জরুরী অধিবেশন ডেকে কঠোর আইন প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করার উপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। হযরত সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী (ম.জি.আ) ইসলাম বিদ্বেষী যে কোন অৎপরতার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসী ও বিশ্ব নেতৃত্বকে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান।

মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে জাতীয় প্রেস ক্লাব অডিটরিয়ামে ‘‘ইসলামের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাবি দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান, ঢাবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান ডঃ আখতারুজ্জামান, ঢাবি ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ডঃ অ.ন.ম রইছ উদ্দিন, আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার নেতৃবৃন্দ আলহাজ্ব মোঃ ইকবাল, সহ-সভাপতি আলহাজ্ব কবির চৌধুরী, সহ-সভাপতি এডভোকেট ওয়াজি উদ্দিন মিয়া, কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক খলিফা আলমগীর খান, সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট জালাল আহমদ, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা রুহুল আমিন ভূঁইয়া, মাওলানা বাকী বিল্লাহ আজহারী, অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাওলানা গোলাম মুহাম্মদ খান সিরাজী, মুফতি ছালেহ সুফিয়ান ফরহাদাবাদী প্রমুখ।

Posted in Uncategorized | Comments Off on মহানবী (দ.), ইসলাম ও কোরআন অবমাননাকারী ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ঠকারীরা সমগ্র মানবতার শত্র“। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে-

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ।

১০ অক্টোবর-১২ বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র নির্মাণ, ফ্রান্সের পত্রিকায় ব্যঙ্গ চিত্র প্রকাশ করে ইসলাম ও রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামকে অবমাননা করা, মিয়ানমারের আকিয়াবে পাঁচশত বৎসর পুরাতন স্থানীয় বড় জামে মসজিদে আগুন লাগানো, বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় উগ্রতা ও হিংসা হানা-হানি সহ মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশে রামু-উখিয়া-পটিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ঠকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে “আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়া”র উদ্যোগে হাজার-হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ আজ বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে ।

চট্টগ্রাম মাইজভান্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন ও আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার সভাপতি হযরত শাহ্সূফী মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী মাইজভান্ডারী (ম.জি.আ) এই মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মডেল হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর নিকট সুপরিচিত । হাজার বছর ধরে এখানে সকল ধর্মের মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছে।

কক্সবাজার রামু-উখিয়া, পটিয়ার বৌদ্ধ-হিন্দু উপসানলয়ে যারা নৃশংস হামলা করেছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যারা একে অণ্যেও উপসনালয় বা অন্য সাধারনের উপর আঘাত করছে তারা মানবতাকে ভূলুন্ঠিত করেছে। তাদের প্রধান পরিচয় হলো তারা দুর্বৃত্ত মানবতা বিরোধী মনুষত্য হীন পশু। তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখতে জাতীয় স্বার্থে সংখ্যালঘুদের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের পাশাপাশি সকলের নৈতিক দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরো বলেন- বিশ্ব শান্তি ও সংহতি রক্ষার প্রয়োজনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারীদের অতি দ্রুত গ্রেফতার পূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করণের বিধান সর্বসম্মত ভাবে আইনে পরিণত করা এবং বিশ্ব সংস্থাকে তা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগের পদক্ষেপ নিতে হবে। কোন প্ররোচনা ও উস্কানিতে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য তিনি মানববন্ধনে সকল ধর্মের অনুসারীদেরকে সহনশীলতার পরিচয় দেয়ার আহবান জানান।

Posted in Uncategorized | Comments Off on চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে আন্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ।