সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ধর্ম ঃ পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ধর্ম ঃ পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম, নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি ওয়া নুছাল্লিমু আলা হাবীবিহিল কারীম ওয়া আলা আলিহী ওয়া সাহ্বিহি ওয়া আওলিয়াইহী আজমাঈন। আম্মাবাদ।

সম্মানিত সভাপতি, প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি, উপস্থিত সম্মানিত সুধী মন্ডলী-আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহ্মাতুল্লাহ।
আন্তর্জাতিক সূফী ঐক্য সংহতি (সূফীজ) এর আয়োজনে দেশ ও জাতির এ সন্ধিক্ষনে এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করার জন্য আমি আয়োজকবৃন্দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আল্লাহ পাক জল্লাজালালুহু কুরআন মজিদে ইরশাদ করেন “মা ইন্দাকুম ইয়ানফাদু ওমা ইন্দাল্লাহি বাক্বীন।” অর্থাৎ- যা কিছু তোমাদের নিকট সঞ্চয় রয়েছে বা যা কিছু তোমাদের নিজের উদ্দেশ্যে করেছো তা সমুদয় ধ্বংস প্রাপ্ত হয়ে যাবে, বিলীন হয়ে যাবে। আর যা কিছু আল্লাহর কোষাগারে জমা রেখেছ যা আল্লাহর উদ্দেশ্যে করেছো তা সমুদয় বাকি থাকবে, সেগুলো অনাদিকাল অক্ষয় থাকবে। তাই চিরস্থায়ী ভাবে কর্মকে চলমান রাখতে হলে তা আল্লাহর নিমিত্তেই করতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি কল্পেই করতে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তাদের আবাস ভূমি রূপে এ পৃথিবী সৃজন করেছেন। সর্ব সৃষ্টিকে মানব কল্যানার্থে সৃজন করেছেন। সুন্দর জাগতিক প্রাকৃতিক পরিবেশও তিনি সৃষ্টি করে রেখেছেন। মানুষ সামাজিক ভাবেই সমাজবদ্ধ জীব।

সমাজ বলতে বুঝায় সুন্দর পরিবেশ; মানুষের নির্বিঘেœ বসবাস করার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা সহকারে সুন্দর জীবন যাপনের ক্ষেত্র। যেখানে মানুষের যাবতীয় মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়। মৌলিক অধিকারের মধ্যে রয়েছে অন্ন-বস্ত্র বাসস্থান, এর সুবিধা। আর নাগরিক অধিকার যেমন-শিক্ষা, চিকিৎসা, নির্বিঘেœ পথ চলা, ধর্ম পালন, জীবিকা নির্বাহ, রুজি-রোজগার, খেয়ে পরে বেঁচে থাকা ইত্যাদি। এসব কিছুর একটিও যদি খর্ব হয় বা লংঘিত হয় তাহলে তা মানবাধিকার লংঘনের পর্যায়ে পড়ে। এসব সঠিকভাবে পালিত হলে সামাজিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকবে।
বর্ণিত সব কিছু যথাযথ ভাবে ভোগ করতে বা পালন করতে ধর্মকে অবলম্বন করতে হয়। কেননা এক্ষেত্রে ধর্মীয় গুরুত্ব সর্বাধিক। ধর্মাচার পালন, ধর্ম চর্চা ও অনুশীলন সুস্থ সমাজ বিনির্মানে ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অতুলনীয় ভূমিকা রাখে। কোন ধর্মেই অসামাজিকতাকে অনুমোদন করে না। হোক সেটা যে কোন ধর্ম। ধর্ম বর্জন, ধর্মত্যাগ, ধর্মাবহেলা, ধর্মবিরোধিতা, ধর্মান্ধতা, ধর্মহীনতা এসব কিছুই অধর্ম। অধর্মের কারনে নৈতিক অবক্ষয় ঘটে যা সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং তাতে সামাজিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়। সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়।

সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে সমাজবদ্ধ মানুষগুলোর নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে হবে, মানুষকে কর্মমুখী করার সাথে সাথে ধর্ম পালনেও উদ্বুদ্ধ করতে হবে, তাদের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা যত বেশী সৃষ্টি করা যাবে তত বেশী সমাজের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে। রক্ষা পাবে সমাজে স্থিতিশীলতা। এক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মের আবেদন খুবই ফলপ্রসূ ও
বাস্তবমুখী। কেননা আল্লাহ পাক এর নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র ধর্ম হলো পবিত্র ইসলাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছে যে, “ইন্নাদ্বীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম” (আল কুরআন) অর্থাৎ- সন্দেহাতীত ভাবে আল্লাহ তা’য়ালার নিকট মনোনীত একমাত্র ধর্ম হলো আল ইসলাম। ইসলাম অর্থ শান্তি ও আনুগত্য। সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ দুটি আবশ্যকীয় ভাবে প্রযোজ্য। কারণ শান্তি বিরাজ করলেই সমাজ সুষ্ঠু সুন্দর ও সুস্থরূপে স্থিতিশীল থাকবে। আর শান্তি পেতে হলে মহান আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য করতে হবে। তাঁর নির্দেশিত জনেরও আনুগত্য করতে হবে। যেমন আল্লাহ পাক কুরআন হাকীমে ইরশাদ করেন- “ইয়া আইউহান্নাছু’ বুদুল্লাহ” অর্থাৎ- হে মানব মন্ডলী তোমরা আল্লাহরই ইবাদত বন্দেগি কর। এ ঘোষণাটি সমগ্র মানবগোষ্ঠির জন্য প্রযোজ্য। আবার নির্দিষ্ট ভাবে ঈমানদার মুমিনের প্রতিও আদেশ জারী করে আল্লাহ পাক তার পাক কালামে অন্যত্র ঘোষণা করেন- “ইয়া আইউহাল্লাজীনা আমানূ আত্বিয়ুল্লাহা ওয়া আত্বিয়ুর রাছুলা ওয়া উলিল আমরি মিনকুম”। অর্থাৎ- তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা ইমামদের আনুগত্য কর।” আল্লাহ রাসূল ও আওলিয়া-এ কেরামের আনুগত্যের মধ্যেই রয়েছে শান্তি। বিশ্ব মানবমন্ডলী শান্তি-স্বস্থির অন্বেষায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় অহনিশি। কিন্তু তা অনেক ক্ষেত্রে সোনার হরিণ হয়ে থাকে। এ শান্তিকে জয় করতে হলে পবিত্র ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়া তলে আমাদেরকে অবস্থান নিতে হবে। আর এ জন্য চাই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কুরআন মজিদে ইরশাদ করেন “ওয়া’তাছিমু বিহাব্লিল্লাহি জামিয়াঁওঅ লা তাফাররাক” অর্থাৎ- তোমরা সকলে আল্লাহর রশিকে একত্রে আকড়ে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না অথবা আল্লাহর রজ্জু হতে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। সুতরাং আল্লাহ পাক ঐক্যের জন্য আদেশ করেন, বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেন।

ঐক্যের জন্য প্রয়োজন সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, কাউকে অবজ্ঞা না করা, ইসলামের শিক্ষাকে নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করা, হিংসা, নিন্দা, পরচর্চা, বিদ্বেষ, হানাহানি, বিবাদ-বিসম্বাদ পরিহার করা। পরমত, সহিষ্ণু হওয়া, আত্ম সমালোচনা করা, পরদোষ পরিহার ও নিজ দোষ ধ্যান করা, ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলামের আলোকে জীবন গঠন করা। কেননা কুরআন হাদিসের আদেশ নিষেধানুযায়ী জীবন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছে এভাবে যে- “মান লাম ইয়াহ্কুম বিমা আনজালাল্লাহু ইলাইকা ফাউলাইকা হুমুজ্জালিমুন” অপর আয়াতে ‘কাফিরুন’ অপর আয়াতে ‘ফাসিকুন’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ- যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কৃত বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না তারা (১) জালিম বা সীমা লংঘনকারী, (২) কাফির বা খোদাদ্রোহী, (৩) ফাসিক বা জঘন্য পাপীষ্ট। তাই সমাজের রন্ধে রন্ধে যদি পবিত্র ইসলামের শ্বাশ্বত বাণীর প্রতিফলন ঘটে, ইসলাম ধর্মের অনুসরণ অনুকরণের মাধ্যমে সমাজবদ্ধ মানুষ নির্বিঘেœ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

ধর্ম নিয়ে কোন বাড়াবাড়ি নয়, অধর্মকে ধর্ম বলে প্রচার চালানোও নয়, ধর্মকে ব্যাঙ্গঁ উপহাস করাও নয়। এমনটি যদি হয় তাহলে সে ধর্মীয় মূল্যবোধ আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অনবদ্য ভূমিকা রাখবে তাতে সন্দেহ নাই। আবহমান কাল ধরে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি বিরাজিত হয়ে আসছে। এ সংস্কৃতিকে ধারণ করে যুগযুগ ধরে এ দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় সম্প্রতি বাংলাদেশে কোন কোন মহলের পক্ষ থেকে ধর্মকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যাবহার করে হিংসাত্মাক ও আক্রমনাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত। তা কোনভাবেই কাম্য নয়। পবিত্র ধর্ম ইসলাম কোন পক্ষের বা গোষ্টির নয়। ইসলামের নামে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্য নিয়ে হানা-হানি, মারামারি করে কোন ক্রমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, ইসলামের শিক্ষা হলো ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির এবং সকল মানুষ একই আদমের সন্তান ও একই স্রষ্টার সৃষ্টি। সমাজে ফেৎনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি, সরল মনা ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে সম্প্রীতি বিনষ্ট ও মানুষের মধ্যে সংঘাত উস্কে দিয়ে সমাজে শান্তি বিনষ্ট করা তা কোন ক্রমেই ইসলাম সমর্থন করে না। বাংলাদেশের জমিনে প্রবর্তিত অন্যতম ত্বরীক্বা ত্বরীক্বায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার আধ্যাত্মিকতা ও দর্শনের মধ্যেও ঐ ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িস্থ মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে ত্বরীক্বায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার উৎপত্তি ও বিকাশের সময় কাল থেকে এযাবৎ কালীন সময় পর্যন্ত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো লাখো আশেক ভক্ত জায়েরিন এর ঢল নামে প্রতিটি ওরশ-খোশরোজ শরিফের দিবস গুলোতে। এতদভিন্ন প্রতিনিয়ত নানা ধর্মের নানা জাতের দর্শনার্থী ভিড় জমায় মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফস্থ রওজা শরিফ গুলোতে আশীষ ও করুনা প্রত্যাশী হয়ে। বিশেষতঃ হযরত গাউছুল আযম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহ্সূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ কাদ্দাছাল্লাহু ছিররাহুল আজিজ, হযরত গাউছুল আযম বাবাভাণ্ডারী মাওলানা শাহ্সূফী সৈয়দ গোলামুর রহমান কাদ্দাছাল্লাহু ছিররাহুল আজিজ এবং গাউছুল ওয়ারা হযরত মাওলানা শাহ্সূফী সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী ওয়াল হোসাইনী আল্-মাইজভাণ্ডারী কাদ্দাছাল্লাহু ছিররাহুল আজিজ এর পাক রওজায় অসংখ্য জায়েরীন জিয়ারতের উদ্দেশ্যে হাজির হয়। এসব মহামনীষী পূণ্যাত্মারা হলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, সর্ব ধর্ম বেষ্টনকারী অর্গলমুক্ত ঐশী প্রেমবাদ ও আধ্যাত্মিকতা এ ত্বরীকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের ভূমিতে ত্বরীক্বায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার আদর্শ ও ধর্মীয় চেতনার উম্মেষ ঘটলে এ দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে পট পরিবর্তন হয়ে যাবে বলে আমার ধারণা । এই ত্বরীকার দিকপাল শায়খুল ইসলাম শাহ্সূফী হযরত মাওলানা সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ আল্-হাসানী আল্ মাইজভান্ডারী কাদ্দাছাল্লাহু ছিররাহুল আজিজ মাইজভান্ডারী ত্বরীকার প্রেমবাদ ও অসম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে জাতিসংঘ সহ সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়িয়েছেন শান্তি প্রতিষ্ঠায়। তাই আসুন! আমরা তারই চেতানাকে ধারন করে সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পবিত্র ধর্ম ইসলামের শান্তির শাশ্বত বানী নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল মতানৈক্যের উর্ধ্বে উঠে কাদে-কাদ মিলিয়ে কাজ করি। পরিশেষে উপস্থিত সকলকে আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য এখানে সমাপ্ত করলাম। আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ।

This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

No Comments