ধর্মে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিঃ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা ডক্টর ম. আখতারুজ্জামান- অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘ধর্মীয় দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিশ্ব শান্তি’ শীর্ষক সেমিনার উপস্থাপিত ধারণাপত্র
২৪ নভেম্বর ২০১২
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, কাকরাইল,ঢাকা।

ধর্মে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিঃ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা
ডক্টর ম. আখতারুজ্জামান-
অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আভিধানিক অর্থে ধর্ম (জবষরমরড়হ) হলোঃ “অ ংঢ়বপরভরপ ভঁহফধসবহঃধষ ংবঃ ড়ভ নবষরবভং ধহফ ঢ়ৎধপঃরপবং মবহবৎধষষু ধমৎববফ ঁড়হ নু ধ হঁসনবৎ ড়ভ ঢ়বৎংড়হং ড়ৎ ংবপঃং,” অর্থৎ “কোন লোকগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সাধারণ ঐকমত্যে গৃহীত এক সেট নির্দিষ্ট মৌলিক বিশ্বাস ও অনুশীলন।” (বিনংঃবৎ’ং ঊহপুপষড়ঢ়বফরপ টহধনৎরফমবফ উরপঃরড়হধৎু, হবি ৎবারংবফ বফরঃরড়হ ১৯৯৬, ংা ঢ়.১২১২) ধর্মের সংজ্ঞায়ন একটি জটিল তার্কিক বিষয়। তবে এর সর্বোত্তম সংজ্ঞায়ন যেভাবেই করা হোক না কেন ধর্ম অভিধাটি স্পষ্টত কতিপয় বৈশিষ্ট্যের ধরনকে ইঙ্গিত করে যার মধ্যে থাকে বিশ্বাস, অনুশীলন, অনুভূতি, জীবনবোধ, মনন, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। (ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরপং বফ. ঔধসবং ঐধংঃরড়হমং, াড়ষ.১০, .৬৬২) এ অর্ধে ধর্মের পরিধি ব্যাপক, বি¯তৃত। এটি বহুমাত্রিক। ধর্ম সকল মানুষের। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন পরিচয়ে। ধর্ম মানুষের জন্য, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। আসলে মানুষের জন্যই সবকিছু। সেজন্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ মধ্য যুগের বাংলার কবি চন্ডীদাস (চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতক) এর এই স্মরণীয় উক্তি, আল-কুরআন এর উল্লিখিত বাণীরই প্রতিধ্বনি। বিদ্রোহী কবি, মরূকবি কাজী নজরুল ইসলামও ধর্ম, জাতি, গোত্রের চেয়ে মানুষই যে সর্বশ্রেষ্ঠ সে কথা আরো জোরালোভাবে বলেছেন তাঁর সাম্যবাদী কাব্যে ও ‘মানুষ’ কবিতায়ঃ
“গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।” (আবদুল কাদির সম্পাদিত, নজরুল রচনাবলী, প্রথমখন্ড, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬, পৃ.২৩৪)

বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বিভক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ে। তাদের মধ্যে বিরোধ, বৈরীতা ও রক্তপাতও দৃশ্যমান হয়েছে ইতিহাসের পথ পরিক্রমায়। অথচ সাম্প্রদায়িকতার এ বিষয়টি ধর্মীয় নীতিমালা বা অনুশাসনে তো নেই-ই, বরঞ্চ রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবতারবাদী চেতনার সুমহান আদর্শ।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেশ হলেও, এটি বহু ধর্ম সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্র একটি বহুমাত্রিক দেশ, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানাবিধ ধর্মের মানুষ বহুদিন ধরে, কিছু বিচ্ছিন্ন অনভিপ্রেত ঘটনা ব্যতীত, একত্রে সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ আবেদন বাংলাদেশের প্রধান ধর্মসমূহে কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার ইঙ্গিত দেয়ার প্রয়াস এ ধারণাপত্রে।
ইসলাম ধর্ম
ইসলাম শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে ‘সাল্ম’ থেকে। ‘সাল্ম’ অর্থ শান্তি। আল্-কুরআন ও মহানবী (সাঃ) প্রচারিত ধর্মকে বলা হয় ইসলাম। ইসলাম বলতে বুঝায় শান্তির পথে অনুপ্রবেশ, আর এর অনুসারী মুসলিম বলতে বোঝায় আল্লাহর ও মানবাত্মার সাথে শান্তি স্থাপন। মুসলিম হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসলাম পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও প্রেরিত পুরুষ এবং তাদের নির্দেশিত ধর্মসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন। (আল-কুরআন ২ঃ৪)
পবিত্র কুরআন সমগ্র মানব জাতিকে একই পরিবারের অন্তর্র্ভক্ত হিসেবে ঘোষণা করে সকল মানুষের মধ্যে সাম্য ও ঐক্যের ধারণা দিয়েছে। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের উৎস এক ও অভিন্ন। আল-কুরআন বলে, “হে মানবজাতি” তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন, তার থেকেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং দু’জন থেকে বহু সংখ্যক নারী ও পুরুষ বিস্তার ঘটিয়েছেন।” (আল্-কুরাআন ৪ঃ১)।
বস্তুতঃ অভিন্ন উৎস থেকেই মানুষ বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, গোত্র ও দলে বিভক্ত হয়েছে। কেন মানুষকে বিভিন্ন গোত্রে ও জাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে সে বিষয়টি পবিত্র কুরআন খোলাশা করে বলেছে এভাবে, “হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে, এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পার।” (সূরা হুজুরাত ৪৯ঃ১৩)। পরস্পরের সাথে পরিচিত হওয়া সদ্ভাব সম্প্রীতির প্রকৃষ্ট উপায়।
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত যে সবচেয়ে খোদাভীরু” পবিত্র কুরআনের (৪৯ঃ১৩)। এই মহৎ বক্তব্যেও সমর্থনে মহানবী (দঃ) মানুষের মধ্যে সাম্য ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে বিদায় হজ্জেও ভাষণে ঘোষনা করেছেনঃ “তোমরা সকলে ভাই ভাই এবং সকলেই সমান। তোমাদের কেই অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারনা। একজন আরব একজন অনারবের উপর এবং একজন অনারব একজন আরবের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। অনুরূপভাবে একজন শ্বেতাঙ্গ একজন কৃষ্ণাঙ্গের উপর এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ একজন শ্বেতাঙ্গের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। কেবল ন্যায়পরায়নতার ভিত্তিতে প্রাধান্য প্রাপ্তি ব্যতীত”। (গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.৩৪০)।

এভাবে ইসলাম জাতি, ধর্ম ও বর্ণের আভিজাত্য, ধনেশ্বর্যের অহংকার, পদমর্যদা ও জ্ঞান গরিমার আস্ফালনকে চুরামান করে সকল মানুষকে সাম্যের শিকলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, ‘ইসলামের বিশ্বজনীন মানবাতবোধঃ সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব,’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৭০-৭২, ফেব্র“য়ারী, ২০০২, পৃ.১৪১)।

পবিত্র কুরআন যে বারবার ‘হে মানব জাতি’ এবং ‘হে আদম সন্তানেরা’ বলে সম্বোধন করে থাকে সেটা এজন্য করে থাকে, যাতে মানুষের মনে মানবীয় ঐক্যের ধারণা সৃষ্টি ও তা বদ্ধমূল হয়ে যায়। অনুরূপভাবে ‘হে ঈমানদারগণ’ এবং ‘হে মুমিনগণ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে যাতে তাদের ভেতরে বংশীয় বা শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টির অবকাশ না থাকে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৪১)।

মানবপ্রেম, বিদ্বেষহীন আচরণ, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির আদর্শই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা। “নিশ্চয়ই মানবজাতি একখন্ড সমাজ” পবিত্র কুরআনের (২:২১৩) এই উদাত্ত ঘোষনার ব্যাখায় বিদায় হজ্বের ভাষণে সমাজের মানুষের প্রতি ভালবাসা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে মহানবী (দঃ) বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহরই পরিবার। যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তবে মানবজাতিকে ভালবাস। যদি সেই প্রভুর (আল্লাহর) সামনে যেতে চাও, তবে তাঁর সৃষ্টজীবকে ভালবাস: যা তোমরা নিজের জন্য পছন্দ কর তাদের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য বর্জন কর, তাদের জন্য তাই বর্জন করবে। তুমি তাদের প্রতি সেই ব্যবহার কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর। তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করোনা, পরস্পর হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না, তোমরা আল্লাহর দাস ও পরস্পর পরস্পরের ভাই হয়ে যাও”। (সৈয়দ বদরুদ্দোজা, হযরত মুহাম্মদ (দঃ): তাহার শিক্ষা ও অবদান ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ.৪৯-৫০, উদ্ধৃতি, মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, প্রগুক্ত, পৃ.১৪২)। বস্তুত: ইসলাম সমগ্র পৃথিবীবাসী, মানুষ, প্রাণী ও জীব জগতের প্রতি সার্বজনীন ভালবাসা ও দয়ার আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) বলেছেন, “যারা দয়া করে দয়াময় আল্লাহ্ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন”। (তিরমিযি ও আবু দাউদ, উদ্ধতি: দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ২০০০ পৃ. ৩৮)।
সার্বজনীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায় মোহাজের (মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকারী) ও আনসার (মদিনাবাসী)-এর মধ্যে ‘ভাই’ সম্বন্ধ স্থাপনের মধ্যে। মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতাব্দীর বিবাদ ভুলিয়ে মহানবী (দঃ) তাদের সাধারণ নাম দিয়েছেন আনসার (সাহায্যকারী)। বস্তুত: ঐতিহাসিক মদিনা সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গবফরহধ)-এর ভিত্তিতে মহানবী (দঃ) এর নেতৃত্বে মদিনা আদর্শ রাষ্ট্র গঠন হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনা তথা মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর সমাগত অপরাধীদের প্রতি মহানবীর (দঃ) ঘোষণা, “তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও তোমরা মুক্ত -ক্ষমা, মহানুভবতা ও মানবিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একইভাবে সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী সেন্টক্যাথেরিন মঠের সাধু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে মহানবী (দঃ) তাদের জীবন, ধর্ম ও সম্পত্তি রক্ষার যে সনদ প্রদান করেন, তা নিজ ধর্মের রাজাদের কাছ থেকেও তারা কখনো পাননি বলে ইতিহাসে প্রমান মেলে। (সৈয়দ আমির আলী, দি স্পিরিট অব ইসলাম [বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মদ দরবেশ আলী খান] ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.১২৮)।
মহানবী (দঃ) বলতেন, “যে ব্যক্তি জিম্মির (ঢ়ৎড়ঃবপঃবফ হড়হ-গঁংষরসং) প্রতি অন্যায় ব্যবহার করবে এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তার উপর চাপিয়ে দিবে আমি পরকালে তার জন্য অভিযোগকারী হবো”। (মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ইসলাম প্রসঙ্গ, রেনেসার্স প্রিন্টার্স, ঢাকা ১৯৬৩, পৃ.৭২)। বস্তুত: সহনশীলতা হলো সেই গুন যা ইসলাম ধারণ করে উদার ও মানবিক গুনে অনন্য সাধারণ। এতদবিষয়ে ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরবং- যথার্থই বলা হয়েছে, “ঞযব ৎবপড়মহরঃরড়হ ড়ভ ৎরাধষ ৎবষরমরড়ঁং ংুংঃবসং ধং ঢ়ড়ংংবংংরহম ফরারহব ৎবাবষধঃরড়হ মধাব ঃড় ওংষধস ভৎড়স ঃযব ড়ঁঃংবঃ ধ ঃযবড়ষড়মরপধষ নধংরং ভড়ৎ ঃযব ঃড়ষবৎধঃরড়হ ড়ভ হড়হ গঁংষরসং” অর্থাৎ ‘প্রতিদ্বন্দি বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক উৎসের স্বীকৃতি দেয়ার শুরু থেকেই ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি সহনশীলতার ধর্মতাত্বিক ভিত্তি লাভ করেছে’।
বস্তুত: ‘লা এক্রাহা ফিদ্ দ্বীন’ (ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই) এবং ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়াদ্বীন’ (তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য) পবিত্র কুরআন-এর এই অমোঘ বাণী বিশ্বের অন্যান্য ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়া ও মেনে নেয়ার এক সুস্পষ্ট চুড়ান্ত নির্দেশ।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-এর আদর্শ ধারণ করেই মুসলিমরা বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, খুব কম সময়ে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমৃদ্ধ, উদার, মানবতবাদী চেতনার সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মানে সক্ষম হয়েছিল। ইসলাম শিক্ষা বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আব্দুর রশিদ যথার্থই বলেন যে, ‘সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের গুনেই বিশ্বমানবের কল্যান সাধন করা, বিশ্বশান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্ব বন্ধুত্ব স্থাপন করা তাদের (মুসলিমদের) পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। যে রাষ্ট্রে বা সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এই আদর্শের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়, সে রাষ্ট্র বা সমাজ মুসলিম রাষ্ট্র বা সমাজ নয়। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৫৬)।

হিন্দু ধর্ম
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় হিন্দু ধর্মের লক্ষণ সম্পর্কে বহা হয়েছে:
“অহিংসা সত্যমস্তেয়ং শৌচং সংযমমেব চ
এতৎ সামাসিকং প্রোক্তং ধর্মস্য পঞ্চলক্ষণম্ ॥”
অর্থাৎ হিংসা না করা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, শুচি থাকা এবং সত্যাশ্রয়ী হওয়া-এই পাঁচটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ। অহিংসা আচরণ তখনই সম্ভব, যখন আমরা সমদর্শী হব অর্থাৎ সকল মানুষকে নিজের মতো মনে করব। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬/৩২)।
মনুসংহিতার মতে ধর্ম হচ্ছে কতগুলো গুণের সমষ্টি। উক্ত হয়েছে-
“ধৃতিঃ ক্ষা দমোহস্তেয়ং
শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো
দশকং ধর্মলক্ষণম্ ॥” (মনুসংহিতা, ৬/৯২)
অর্থাৎ সহিষ্ণুতা (ধৈর্য), ক্ষমা (ক্ষমাশীলতা), আত্ম-সংযম, চুরি না করা (পরস্ব অপহরণ না করা), শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, শুদ্ধবুদ্ধি (প্রজ্ঞা), বিদ্যা (জ্ঞান), সত্য এবং অক্রোধ (ক্রোধহীনতা) এই দশটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ।
এই দশটি গুন যিনি যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারেন তাঁর মধ্যে মানুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। এ আলোকে হিন্দুধর্ম কোন বিশেষ স্থান, কাল, জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে ধর্মাচরনের বিধান দেয় নি। সকল দেশের, সকল কালের, সকল মানুষের পক্ষে যা কল্যাণকর সেটিই হচ্ছে হিন্দুধর্মের নির্দেশনা। হিন্দুধর্ম বহু মত ও পথের সমন্বয়ে সৃষ্টি। অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী, একেশ্বরবাদী, আস্তিক, নাস্তিক, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি বিভিন্ন ধারার বিশ্বাস মত ও পথ এর ধর্মদেহে লীন হয়েছে একান্তভাবে। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন- ‘যত মত তত পথ’। ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান’-এটাই হিন্দুধর্মের মূল চেতনা। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তা এখানে স্বীকার্য। মানবিক মূল্যবোধে, মানবিক কল্যাণে যা কিছু তা এখানে গ্রহণীয়। এটা কেবল সম্ভব মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বিভিন্ন মত ও পথের প্রতি সীমাহীন সহিষ্ণুতা ও প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ থেকে। হিন্দুধর্মের এই যে ঔদার্য, বিশালতা, মানবিক বিকাশের ধারা এবং তার অন্তরের সঞ্জীবনী শক্তি তা নিঃসন্দেহে নন্দিত।
হিন্দুধর্ম বিশ্বাসে কেবল সর্বজনীন সহনশীলতাই নেই বরং এখানে একটা দৃঢ় প্রতীতি আছে যে পৃথিবীতে যদি কোনো একটি ধর্ম সত্য হয় তাহলে অন্য ধর্মগুলোও সত্য। সকল ধর্মে, সর্বকালে এবং সব দেশেই হতে পারে অবিনাশী বাণীর উচ্চারণ ও মহিমান্বিত পুরুষের আবির্ভাব। হিন্দুধর্মের মানবিক ঔদার্য্য, চিন্তার প্রসারতা, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি বিচার বিশেষণ করে একে যদি কেউ বলে ‘মানবধর্ম’ তাহলেও অত্যুক্তি হবে না।
হিন্দুধর্মের প্রধান দিক সকল জীবের মধ্যে ঈশ্বর দর্শন, সকলকে ভালোবাসাই ধর্ম- এই চেতনাটি বীর সন্ন্যাসী বিবেকান্দের ভাষায় প্রতিফলিত হয়েছে অনুপমভাবে-
“ব্রহ্ম হতে কীট-পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মনপ্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে এ সবের পায়।
বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন ও সাম্যের বাণী প্রচারই হিন্দু ধর্মে মূল লক্ষ্য। বেদ, উপনিষদ, রাময়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সহ প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই জীবের প্রতি ভালোবাসার কথা, মানবকল্যাণের কথা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাম্যের (শান্তির) বাণী প্রচারিত হয়েছে। উক্ত হয়েছে-
“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম॥
এম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ”।
(শ্রীমদ্বদ্গীতা, ৪/১১)
অর্থাৎ ‘হে পার্থ’ যে আমাকে যেভাবে উপাসনা করে, আমি তাকে যেভাবেই তুষ্ট করি। মনুষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথের অনুসরণ করে’।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী মহাপুরুষগণের ধর্মচিন্তার প্রধানভিত্তি মানবতাবাদ। তাঁরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখতেন এবং সকল ধর্মের মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসতেন। লোকনাথ ব্রক্ষচারী বলেছেন-
“ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য এসবই
জগতের ব্যবহারিক সত্য, মনের
সৃষ্টি। আমি যে জগতের লোক
সেখানে নেই কোনো ভেদ, সেখানে
সবই সমান-সবই সুন্দর”॥
অর্থাৎ ‘তোমরা সংযুক্ত হও, একবিধ বাক্য প্রয়োগ কর, তোমাদের মনসমূহ জ্ঞাত হোক সমানরূপে। তোমাদের সংকল্প সমান, তোমাদের হৃদয়সমূহ সমান এবং সমান হোক তোমাদের আন্তঃকরণসমূহ। যাতে তোমাদের পরম ঐক্য হয়, তাই হোক’।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “যুদ্ধ নয়, সহমর্মিতা; ধ্বংস নয়,সৃষ্টি; সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতি’। তিনি আরো বলেছেন ‘বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি’। বস্তুত: বিশ্বশান্তির জন্য প্রয়োজন হিন্দুধর্ম প্রস্ফুটিত মহান ঐক্য ও সম্প্রীতির বাণী মনেপ্রাণে ধারণ করে কাজ করা।
ওঁ শান্তি (ওম্ শান্তি)- এতো সকল মানুষের জন্যই শান্তি কামনা, কাউকে বাদ দিয়ে নয়। এটি হিন্দু ধর্মের সার্বজনীন সদ্ভীব ও সম্প্রীতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরন।

বৌদ্ধ ধর্ম
আজ থেকে আড়াইহাজার বছর পূর্ব জন্মালাভকারী মহামানব গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত ধর্ম বৌদ্ধধর্ম নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মানবসভ্যতায় ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবিক সাধনার এক অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত বুদ্ধজীবন। বুদ্ধের চিন্তা-চেতনা ও কর্মের মধ্যে মানবের কল্যাণ প্রকৃষ্টভাবে দেখা যায়।

বুদ্ধ লোভ-দ্বেষ-মোহ পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন। মানুষের কল্যাণ, সুখ-শান্তি, দুঃখমুক্তির কথা বলেছেন। তিনি সকল মানুষকে এক এবং অভিন্ন করে দেখতেন। তিনি ধর্মপ্রচার করার সময় তাঁর শিষ্যদেরকে উপলক্ষ্য করে বলেছিলেন; ‘হে ভিক্ষুগণ! বহুজনের সুখের জন্য, বহুজনের মঙ্গলের জন্য তোমরা দিকে দিকে বিচরণ করো, এমন ধর্ম দেশনা করো যার আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ (মহাবর্গ পৃ.২২)। বুদ্ধের এই বাণী চিরন্তন এবং চিরশ্বাশত। এখানে বুদ্ধ সকল সম্প্রদায়ের সুখ ও মঙ্গলের কথা বলেছেন। সকলের কল্যাণের কথা বলেছেন। পারস্পরিক সদ্ভাব-সম্প্রীতির কথা বলেছেন।
বুদ্ধ মানুষে মানুষে এমন কি নারী-পুরুষে ভেদাভেদ করেননি। তিনি সাম্যেও ধারণা দিয়েছেন। তাঁর ধর্মে নেই কোন জাত-অজাতের অভিমান। তিনি বলেছিলেন: গঙ্গা, যমুনা প্রভৃতি বড় বড় নদী যেমন সমুদ্রে মিলে স্বতন্ত্র সত্তা ও নাম হারিয়ে অনুরূপভাবে ব্রাক্ষন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ ভিক্ষু-সঙ্ঘে স্থান পায়। তিনি ছিলেন রাজপুত্র। তিনি ধনী-গরীব, উচু-নীচু সবাইকে ভালোবাসতেন। শুধু তাই নয়, সকলকে তাঁর ধর্মে অংশ গ্রহন করারও সুযোগ করে দিতেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্যে শান্তিময় জীবনযাপন প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন: ‘বৈরীদের মধ্যে বৈরীহীন হয়ে, হিংসাকারীদের মধ্যে অহিংস হয়ে সুখে জীবনযাপন করো’। (ধর্মদপ/গাথা সংখ্যা,১৯৭)। মৌমাছি যেমন ফুলের বর্ণগন্ধ ও আকৃতি বিনষ্ট না করে শুধু মধু আহরণ করে, তেমনি মানুষকেও সমাজে কারো ক্ষতি বা অনিষ্ট না করে শুদ্ধভাবে জীবনযাপন করা উচিত। তিনি আরো বলেন: ‘খারাপ চরিত্র সম্পন্ন ব্যাক্তির নিন্দা ও অকীর্তি প্রচার হয়। গুণী, পন্ডিত, বিনয়ী ব্যাক্তির প্রশংসা ও গুণকীর্তি অর্জন লাভ করে’ (থের গাথা, পৃ.৩৬২)। এখানে তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সলকে উপলক্ষ্য করেই এই উপদেশ প্রদান করেছিলেন।
সংযমের মাধ্যমে পরিচালিত চিত্তই সবাইকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন; ‘বৈরী বৈরীর বা শত্র“র শত্র“র যে অনিষ্ট সাধন করে, বিপথে পরিচালিত চিত্ত তাঁর চেয়ে অধিক অনিষ্টকারী হয়’ (ধর্মপদ, গাথা সংখ্যা ৪২)। এখানে চিত্ত সংযমের কথা বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে সকল প্রকার সম্প্রীতি-সদ্ভাব বিনষ্ট হওয়ার পেছনে এই মন বা চিত্তই প্রধান ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বুদ্ধ, মনকে সংযত করার কথা বলেছেন।

বিশ্বে কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় বৌদ্ধধর্ম তার নির্দেশনা রয়েছে। শুধু মানুষ নয়, যে কোনো প্রাণীর প্রতি হিংসা করা ও পাপ। বুদ্ধবাণীর মূল কথা হলো অহিংসা, সর্বজনীন শান্তি, মৈত্রী, পরমতসহিষ্ণুতা, উদারতা। এই উপদেশগুলো সর্বকালের এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য।
লোভ-দ্বেষ-মোহের কারণে মানুষ মানসিক এবং শারীরিক অশান্তি, দুঃখ, যন্ত্রণা পায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধের ‘অহিংসা পরম ধম্ম’ ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। শান্তি বিনষ্টকারী সকল প্রকার প্রচেষ্টা ও কার্যকলাপ বৌদ্ধধর্মে নিশিদ্ধ। বুদ্ধের নিষিদ্ধ পঞ্চ বানিজ্যেও মধ্যে মদ, বিষ, মৎস, প্রাণী এবং অস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:
সব্বে তসন্তি দন্ডস্স সব্বেসং জীবিতং পিয়ং
অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয়্য ন ঘাতয়ে। (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা, ১২৯)
অথাৎ, ‘সকলেই দন্ডকে ভয় পায়। কেননা, জীবন সকলের প্রিয়। নিজের সাথে তুলনা করে কাউকে আঘাত বা হত্যা করবে না’। বুদ্ধ অস্ত্র বা শক্তির জয় অপেক্ষা আত্মজয়কে শ্রেষ্ঠ জয় বলেছেন। তিনি বলেন: ‘যিনি যুদ্ধে হাজার বার হাজারো মানুষকে জয় করেন তার সেই জয় অপেক্ষা যিনি একমাত্র নিজেকে জয় করেছেন তিনিই শ্রেষ্ঠ বিজয়ী’। বুদ্ধ আরো বলেন: ‘অক্রোধের দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, সাধুতা দ্বারা অসাধুকে জয় করবে, সত্যের দ্বারা মিথ্যাকে জয় করবে, ত্যাগ দ্বারা কৃপণকে জয় করবে’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/৫)। বুদ্ধের অন্যতম শিক্ষা হলো ‘জগতে শত্র“তার দ্বারা শত্র“তার কখনো প্রশমিত হয় না। শত্র“তাহীনতার দ্বারাই শত্র“তা উপশম হয়’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/২২৩)।

সুত্র নিপাত নামক গ্রন্থের ‘মৈত্রী সূত্রে’ উক্ত হয়েছে: ‘কেউ কাকেও বঞ্চনা করবে না। ছোট-বড়, উত্তম-অধম বলে কাকে অবজ্ঞা করবে না, ক্রোধ বা হিংসা করবে না, কেউ কারো দুঃখ কামনা করবে না। মা যেমন নিজের জীবনের বিনিময়ে তার একমাত্র সন্তানকে রক্ষা করেন তদ্রুপ সকল প্রাণির প্রতি অপরিমেয় মৈত্রী পোষণ করবে’ (পৃ.৩৬)। আদর্শ সমাজ, পরিবার, উন্নত জীবনগঠন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিশ্বশান্তি ও ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ়করণে বুদ্ধবাণী অপরিহার্য।

সব্বে সত্তা সখিতা অর্থাৎ: ‘সকলের মঙ্গল হোক, কল্যাণ হোক’। বুদ্ধের এই অমোঘ বাণী সকল সম্প্রদায়ের, সকল মানুষের জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক অসাধারণ বাণী।

খ্রিস্টধর্ম
পবিত্র বাইবেল ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে মানুষের আচরণের প্রধান চালিকাশক্তি হলো ধর্ম। প্রকৃত ধর্মের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে মানুষের কর্মে, অপর মানুষের প্রতি তার আচরণে। ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য সৃষ্ট হয়নি। বাইবেলে প্রবক্তা মীমা প্রকৃত ধর্মের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “ ঞড় ধপঃ লঁংঃষু, ষড়াব ঃবহফবৎষু ধহফ ধিষশ যঁসনষু নবভড়ৎব এড়ফ.” অর্থাৎ ধর্ম হলো ‘ন্যায় সঙ্গতভাবে কাজ করা, কোমল হৃদয়ে ভালবাসা এবং বিনম্রচিত্তে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে যাওয়া’।

বাইবেলের আদি পুস্তকে মানব পরিবারের যাত্রা শুরুর কথা বলা হয়েছে: ‘ঈশ্বর তাঁর মূর্তিতে আপন ‘সাদৃশ্যে’ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের পুরুষ ও নারী করেই সৃষ্টি করলেন। ঈশ্বর মানুষকে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমরা প্রজাবন্ত হও ও বংশ বৃদ্ধি কর”। (আদিপুস্তক ১:২৬-২৭)। এভাবে পরিবার মিলন, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনে একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ বিনির্মিত হয়েছে।
খ্রিস্টধর্ম মতে, জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেহেতু মানুষ, সবার জীবনের উৎস যেহেতু এক ও অভিন্ন সকলের সৃষ্টিকর্তাও যেহেতু মাত্র একজন, তাই সকল মানুষই এক মানব পরিবারের সদস্য-সদস্যা। বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিষ্ঠাতা কোন নিদিষ্ট জনগোষ্টিার নয়, অধিপত্যবাদেও স্থান ধর্মে নেই। রয়েছে সার্বজননীনতা।

‘নতুন বিশ্ব’ বাইবেলের ভাষায় নতুন স্বর্গ ও নতুন পৃথিবী, যেখানে ‘মানুষেদের মাঝখানে পরমেশ্বরের আবাস। তিনি তাদের সঙ্গে বসবাস করবেন; তারা হবে তাঁর আপন জাতি। স্বয়ং পরমেশ্বর তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবেন; তিনি হবেন তাদের আপন ঈশ্বর, তাদের চোখ থেকে মুছিয়ে দেবেন সমস্ত অশ্র“জল। তখন মৃত্যু আর থাকবে না, থাকবেনা আর শোক, আর্তনাদ, দুঃখ যন্ত্রণা’ (প্রত্যাদেশ ২১, ৩খ-৪ক)
বাইবেলে বর্ণিত ঐশি বিষয়াবলি বিশ্লেষণ করে ১৯৬৫-এ দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভায় (ঠধঃরপধহ ঈড়ঁহপরষ ১১) ‘অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর (ঈযঁৎপয) সম্পর্ক বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ -এ বলা হয় যে, ‘সব মানুষ মিলেমিশে একটি সমাজ গঠিত হয়, কারণ সব মানুষ এসেছে একই উৎসমূল থেকে যা ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন সারা পৃথিবীটাকে মানুষের বাসভূমি করার জন্য। সব মানুষ একই গন্তব্যের দিকে তথা ঈশ্বরের দিকে ধাবিত। ঈশ্বরের তত্ত্বাবধান, তার সুস্পষ্ট উত্তমতা ও ত্রাণমূলক পরিকল্পনা সকল মানুষের জন্য পরিব্যপ্ত; সকল মানুষ পূণ্য নগরীতেই একত্রিত হবে’। এ আলোকে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়কে স্বীকার করে এ-ঘোষণায় বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিরাজমান অন্যান্য ধর্ম নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক বিধান ও পূর্জা অর্চনার মাধ্যমে জীবন যাত্রার সুবিন্যস্ত প্রণালী উদ্ভাবন করে নিজ নিজ উপায়ে চেষ্টা করে থাকে মানব হৃদয়কে শান্ত করার জন্য। মানুষে মানুষে, এমনকি জাতিতে জাতিতে একতা ও ভালবাসা লালন করার জন্য খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কী কী বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করা যায় তার প্রতি গুরুত্বরোপ করা হয়। সবশেষে সকল খ্রিস্টভক্তদের প্রতি আহবান জানানো হয় যেন তারা তাদের বিশ্বাস ও জীনবযাত্রার সাক্ষ্য দিতে দিতে অখ্রিস্টানদের মধ্যে বিরাজমান আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্যগুলো এবং তাদের সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতি যেন স্বীকার, সংরক্ষণ ও উৎসাহিত করেন।

ভালবাসা খ্রিস্ট ধর্মমতের এক মৌলিক শিক্ষা। ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এতই নির্ভরশীল যে, পবিত্র শাস্ত্র বলে, “যে ভালবাসেনা, সে পরমেশ্বরকে মানে না”। পূণ্য প্রেরিত পিতর ও পলের অনুসরণ করে ভাতিকান সহাসভা খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসীদের অনুরোধ জানায় যেন বিধর্মীদের প্রতি তারা সদাচরণ করে চলেন এবং নিজেদের পক্ষ থেকে সব মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করে স্বর্গীয় পিতার সত্যিকার সন্তান হয়ে উঠেন। (দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভা “অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর সম্পর্ক বিষয়েক ঘোষণাপত্র”, ২৮ অক্টোবর, ১৯৬৫)।
প্রয়াত পোপ দ্বিতীয় জন পল-এর ভাষায়, “চবধপব ফবসধহফ ধ সবহঃধষরঃু ধহফ ধ ংঢ়রৎরঃ যিরপয নবভড়ৎব ঃঁৎহরহম ঃড় ড়ঃযবৎং, সঁংঃ ঢ়বৎসবধঃব যরস যিড় রিংযবং ঃড় নৎরহম ঢ়বধপব. চবধপব রং ভরৎংঃ ধহফ ভড়ৎবসড়ংঃ ঢ়বৎংড়হধষ, নবভড়ৎব রঃ রং ংড়পরধষ. অহফ রঃ রং ঢ়ৎবপরংবষু ঃযরং ংঢ়রৎরঃ ড়ভ ঢ়বধপব যিরপয রঃ রং ঃযব ফঁঃু ড়ভ বাবৎু ঃৎঁহ ভড়ষষড়বিৎ ড়ভ ঈযৎরংঃ ঃড় পঁষঃরাধঃব”. এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ এর ৩-৪ জুলাই ‘মুসলমান-ক্যাথলিক যোগাযোগ কমিশন’ – এর উদ্যোগে ‘বিশ্বায়ন যুগে ধর্ম ও সভ্যতার সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনায় পরিসমাপ্তিতে এক যুক্ত ইশতিহারে বিশ্বায়নের গুরুত্ব ও শুভফল স্বীকার করে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয় কতিপয় ভয়ঙ্কর দিকের কথা ‘যা সর্বজন স্বীকৃত ও ন্যায্য নীতিমালা প্রণয়নে, ধর্মরে প্রতি সম্মান এবং মানুষের কৃষ্টিগত মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সাথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে’। পরিশেষে মুসলমান ও ক্যাথলিক যৌথ কমিশন একমত হয়ে বলেছেন যে, সংলাপের কৃষ্টি গড়া, ভোগবাদের প্রতিরোধ করা উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সকল প্রকার বৈষম্য বর্জন করার জন্য তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।

উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশের তথা বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিটির মৌলিক দর্শন এক ও অভিন্ন। আর তা হলো অহিংসা, ভালবাসা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধারণা। মানবজাতি এখানে মূল উপজীব্য। মানব প্রেম ও মানব কল্যান সাধন সকল ধর্মের মূল-শিক্ষা। মানবতাবাদী চেতনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনেই ধর্মের সাফল্য নিহিত। ভারতবর্ষে এ আদর্শের ব্যতায় অবলোকন করে বিশ শতকের ত্রিশের দশকে হিন্দু মুসলমান প্রবন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন: “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাধনে তাকে বাঁধতে পারেনা, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটিকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে, রাষ্ট্রিক স্বার্থবৃদ্ধি কি সে দেশকে বাঁচাতে পারে?’ (‘হিন্দু মুসলমান ২’, কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী, (স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সম্পাদিত), দ্বাদশ খন্ড, ঐতিহ্য সংস্করণ, জানুয়ারী ২০০৪, পৃ.৭০৬)।
বস্তুত: হোমো, স্যাপিয়েন্স লিন (ঐড়সড় ংধঢ়রবহং খ) পরিবারের সদস্য হিসেবে মানবতাবাদী চেতনার সূত্রে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখাই হলো সকল ধর্মের মূল শিক্ষা।
ঝঁভর টহরঃু ঋড়ৎ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঝড়ষরফধৎরঃু (ঝটঋওঝ) আয়োজিত
‘ধর্মীয় দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিশ্ব শান্তি’ শীর্ষক সেমিনার উপস্থাপিত ধারণাপত্র
২৪ নভেম্বর ২০১২
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, কাকরাইল,ঢাকা।

ধর্মে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিঃ কিছু প্রাসঙ্গিক কথা
ডক্টর ম. আখতারুজ্জামান-
অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আভিধানিক অর্থে ধর্ম (জবষরমরড়হ) হলোঃ “অ ংঢ়বপরভরপ ভঁহফধসবহঃধষ ংবঃ ড়ভ নবষরবভং ধহফ ঢ়ৎধপঃরপবং মবহবৎধষষু ধমৎববফ ঁড়হ নু ধ হঁসনবৎ ড়ভ ঢ়বৎংড়হং ড়ৎ ংবপঃং,” অর্থৎ “কোন লোকগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সাধারণ ঐকমত্যে গৃহীত এক সেট নির্দিষ্ট মৌলিক বিশ্বাস ও অনুশীলন।” (বিনংঃবৎ’ং ঊহপুপষড়ঢ়বফরপ টহধনৎরফমবফ উরপঃরড়হধৎু, হবি ৎবারংবফ বফরঃরড়হ ১৯৯৬, ংা ঢ়.১২১২) ধর্মের সংজ্ঞায়ন একটি জটিল তার্কিক বিষয়। তবে এর সর্বোত্তম সংজ্ঞায়ন যেভাবেই করা হোক না কেন ধর্ম অভিধাটি স্পষ্টত কতিপয় বৈশিষ্ট্যের ধরনকে ইঙ্গিত করে যার মধ্যে থাকে বিশ্বাস, অনুশীলন, অনুভূতি, জীবনবোধ, মনন, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। (ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরপং বফ. ঔধসবং ঐধংঃরড়হমং, াড়ষ.১০, .৬৬২) এ অর্ধে ধর্মের পরিধি ব্যাপক, বি¯তৃত। এটি বহুমাত্রিক। ধর্ম সকল মানুষের। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন পরিচয়ে। ধর্ম মানুষের জন্য, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। আসলে মানুষের জন্যই সবকিছু। সেজন্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ মধ্য যুগের বাংলার কবি চন্ডীদাস (চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতক) এর এই স্মরণীয় উক্তি, আল-কুরআন এর উল্লিখিত বাণীরই প্রতিধ্বনি। বিদ্রোহী কবি, মরূকবি কাজী নজরুল ইসলামও ধর্ম, জাতি, গোত্রের চেয়ে মানুষই যে সর্বশ্রেষ্ঠ সে কথা আরো জোরালোভাবে বলেছেন তাঁর সাম্যবাদী কাব্যে ও ‘মানুষ’ কবিতায়ঃ
“গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।” (আবদুল কাদির সম্পাদিত, নজরুল রচনাবলী, প্রথমখন্ড, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬, পৃ.২৩৪)

বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বিভক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ে। তাদের মধ্যে বিরোধ, বৈরীতা ও রক্তপাতও দৃশ্যমান হয়েছে ইতিহাসের পথ পরিক্রমায়। অথচ সাম্প্রদায়িকতার এ বিষয়টি ধর্মীয় নীতিমালা বা অনুশাসনে তো নেই-ই, বরঞ্চ রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবতারবাদী চেতনার সুমহান আদর্শ।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাধিক্য দেশ হলেও, এটি বহু ধর্ম সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্র একটি বহুমাত্রিক দেশ, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানাবিধ ধর্মের মানুষ বহুদিন ধরে, কিছু বিচ্ছিন্ন অনভিপ্রেত ঘটনা ব্যতীত, একত্রে সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ আবেদন বাংলাদেশের প্রধান ধর্মসমূহে কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার ইঙ্গিত দেয়ার প্রয়াস এ ধারণাপত্রে।
ইসলাম ধর্ম
ইসলাম শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে ‘সাল্ম’ থেকে। ‘সাল্ম’ অর্থ শান্তি। আল্-কুরআন ও মহানবী (সাঃ) প্রচারিত ধর্মকে বলা হয় ইসলাম। ইসলাম বলতে বুঝায় শান্তির পথে অনুপ্রবেশ, আর এর অনুসারী মুসলিম বলতে বোঝায় আল্লাহর ও মানবাত্মার সাথে শান্তি স্থাপন। মুসলিম হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসলাম পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও প্রেরিত পুরুষ এবং তাদের নির্দেশিত ধর্মসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন। (আল-কুরআন ২ঃ৪)
পবিত্র কুরআন সমগ্র মানব জাতিকে একই পরিবারের অন্তর্র্ভক্ত হিসেবে ঘোষণা করে সকল মানুষের মধ্যে সাম্য ও ঐক্যের ধারণা দিয়েছে। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের উৎস এক ও অভিন্ন। আল-কুরআন বলে, “হে মানবজাতি” তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন, তার থেকেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং দু’জন থেকে বহু সংখ্যক নারী ও পুরুষ বিস্তার ঘটিয়েছেন।” (আল্-কুরাআন ৪ঃ১)।
বস্তুতঃ অভিন্ন উৎস থেকেই মানুষ বিভিন্ন জাতি, উপজাতি, গোত্র ও দলে বিভক্ত হয়েছে। কেন মানুষকে বিভিন্ন গোত্রে ও জাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে সে বিষয়টি পবিত্র কুরআন খোলাশা করে বলেছে এভাবে, “হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী থেকে, এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পার।” (সূরা হুজুরাত ৪৯ঃ১৩)। পরস্পরের সাথে পরিচিত হওয়া সদ্ভাব সম্প্রীতির প্রকৃষ্ট উপায়।
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত যে সবচেয়ে খোদাভীরু” পবিত্র কুরআনের (৪৯ঃ১৩)। এই মহৎ বক্তব্যেও সমর্থনে মহানবী (দঃ) মানুষের মধ্যে সাম্য ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে বিদায় হজ্জেও ভাষণে ঘোষনা করেছেনঃ “তোমরা সকলে ভাই ভাই এবং সকলেই সমান। তোমাদের কেই অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারনা। একজন আরব একজন অনারবের উপর এবং একজন অনারব একজন আরবের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। অনুরূপভাবে একজন শ্বেতাঙ্গ একজন কৃষ্ণাঙ্গের উপর এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ একজন শ্বেতাঙ্গের উপর প্রাধান্য লাভ করবে না। কেবল ন্যায়পরায়নতার ভিত্তিতে প্রাধান্য প্রাপ্তি ব্যতীত”। (গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.৩৪০)।

এভাবে ইসলাম জাতি, ধর্ম ও বর্ণের আভিজাত্য, ধনেশ্বর্যের অহংকার, পদমর্যদা ও জ্ঞান গরিমার আস্ফালনকে চুরামান করে সকল মানুষকে সাম্যের শিকলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, ‘ইসলামের বিশ্বজনীন মানবাতবোধঃ সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব,’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৭০-৭২, ফেব্র“য়ারী, ২০০২, পৃ.১৪১)।

পবিত্র কুরআন যে বারবার ‘হে মানব জাতি’ এবং ‘হে আদম সন্তানেরা’ বলে সম্বোধন করে থাকে সেটা এজন্য করে থাকে, যাতে মানুষের মনে মানবীয় ঐক্যের ধারণা সৃষ্টি ও তা বদ্ধমূল হয়ে যায়। অনুরূপভাবে ‘হে ঈমানদারগণ’ এবং ‘হে মুমিনগণ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে যাতে তাদের ভেতরে বংশীয় বা শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টির অবকাশ না থাকে। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৪১)।

মানবপ্রেম, বিদ্বেষহীন আচরণ, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির আদর্শই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা। “নিশ্চয়ই মানবজাতি একখন্ড সমাজ” পবিত্র কুরআনের (২:২১৩) এই উদাত্ত ঘোষনার ব্যাখায় বিদায় হজ্বের ভাষণে সমাজের মানুষের প্রতি ভালবাসা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে মহানবী (দঃ) বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহরই পরিবার। যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তবে মানবজাতিকে ভালবাস। যদি সেই প্রভুর (আল্লাহর) সামনে যেতে চাও, তবে তাঁর সৃষ্টজীবকে ভালবাস: যা তোমরা নিজের জন্য পছন্দ কর তাদের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য বর্জন কর, তাদের জন্য তাই বর্জন করবে। তুমি তাদের প্রতি সেই ব্যবহার কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর। তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করোনা, পরস্পর হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না, তোমরা আল্লাহর দাস ও পরস্পর পরস্পরের ভাই হয়ে যাও”। (সৈয়দ বদরুদ্দোজা, হযরত মুহাম্মদ (দঃ): তাহার শিক্ষা ও অবদান ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ.৪৯-৫০, উদ্ধৃতি, মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, প্রগুক্ত, পৃ.১৪২)। বস্তুত: ইসলাম সমগ্র পৃথিবীবাসী, মানুষ, প্রাণী ও জীব জগতের প্রতি সার্বজনীন ভালবাসা ও দয়ার আচরণ করতে নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) বলেছেন, “যারা দয়া করে দয়াময় আল্লাহ্ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন”। (তিরমিযি ও আবু দাউদ, উদ্ধতি: দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ২০০০ পৃ. ৩৮)।
সার্বজনীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায় মোহাজের (মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকারী) ও আনসার (মদিনাবাসী)-এর মধ্যে ‘ভাই’ সম্বন্ধ স্থাপনের মধ্যে। মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতাব্দীর বিবাদ ভুলিয়ে মহানবী (দঃ) তাদের সাধারণ নাম দিয়েছেন আনসার (সাহায্যকারী)। বস্তুত: ঐতিহাসিক মদিনা সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গবফরহধ)-এর ভিত্তিতে মহানবী (দঃ) এর নেতৃত্বে মদিনা আদর্শ রাষ্ট্র গঠন হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনা তথা মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর সমাগত অপরাধীদের প্রতি মহানবীর (দঃ) ঘোষণা, “তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও তোমরা মুক্ত -ক্ষমা, মহানুভবতা ও মানবিকতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একইভাবে সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী সেন্টক্যাথেরিন মঠের সাধু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে মহানবী (দঃ) তাদের জীবন, ধর্ম ও সম্পত্তি রক্ষার যে সনদ প্রদান করেন, তা নিজ ধর্মের রাজাদের কাছ থেকেও তারা কখনো পাননি বলে ইতিহাসে প্রমান মেলে। (সৈয়দ আমির আলী, দি স্পিরিট অব ইসলাম [বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মদ দরবেশ আলী খান] ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.১২৮)।
মহানবী (দঃ) বলতেন, “যে ব্যক্তি জিম্মির (ঢ়ৎড়ঃবপঃবফ হড়হ-গঁংষরসং) প্রতি অন্যায় ব্যবহার করবে এবং তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তার উপর চাপিয়ে দিবে আমি পরকালে তার জন্য অভিযোগকারী হবো”। (মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ইসলাম প্রসঙ্গ, রেনেসার্স প্রিন্টার্স, ঢাকা ১৯৬৩, পৃ.৭২)। বস্তুত: সহনশীলতা হলো সেই গুন যা ইসলাম ধারণ করে উদার ও মানবিক গুনে অনন্য সাধারণ। এতদবিষয়ে ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ জবষরমরড়হ ধহফ ঊঃযরবং- যথার্থই বলা হয়েছে, “ঞযব ৎবপড়মহরঃরড়হ ড়ভ ৎরাধষ ৎবষরমরড়ঁং ংুংঃবসং ধং ঢ়ড়ংংবংংরহম ফরারহব ৎবাবষধঃরড়হ মধাব ঃড় ওংষধস ভৎড়স ঃযব ড়ঁঃংবঃ ধ ঃযবড়ষড়মরপধষ নধংরং ভড়ৎ ঃযব ঃড়ষবৎধঃরড়হ ড়ভ হড়হ গঁংষরসং” অর্থাৎ ‘প্রতিদ্বন্দি বিভিন্ন ধর্মের আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক উৎসের স্বীকৃতি দেয়ার শুরু থেকেই ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি সহনশীলতার ধর্মতাত্বিক ভিত্তি লাভ করেছে’।
বস্তুত: ‘লা এক্রাহা ফিদ্ দ্বীন’ (ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই) এবং ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়াদ্বীন’ (তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য) পবিত্র কুরআন-এর এই অমোঘ বাণী বিশ্বের অন্যান্য ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়া ও মেনে নেয়ার এক সুস্পষ্ট চুড়ান্ত নির্দেশ।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-এর আদর্শ ধারণ করেই মুসলিমরা বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, খুব কম সময়ে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমৃদ্ধ, উদার, মানবতবাদী চেতনার সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মানে সক্ষম হয়েছিল। ইসলাম শিক্ষা বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আব্দুর রশিদ যথার্থই বলেন যে, ‘সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের গুনেই বিশ্বমানবের কল্যান সাধন করা, বিশ্বশান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্ব বন্ধুত্ব স্থাপন করা তাদের (মুসলিমদের) পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। যে রাষ্ট্রে বা সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এই আদর্শের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়, সে রাষ্ট্র বা সমাজ মুসলিম রাষ্ট্র বা সমাজ নয়। (মুহাম্মদ আব্দুর রশিদ, পূর্বোক্ত, পৃ.১৫৬)।

হিন্দু ধর্ম
শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় হিন্দু ধর্মের লক্ষণ সম্পর্কে বহা হয়েছে:
“অহিংসা সত্যমস্তেয়ং শৌচং সংযমমেব চ
এতৎ সামাসিকং প্রোক্তং ধর্মস্য পঞ্চলক্ষণম্ ॥”
অর্থাৎ হিংসা না করা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, শুচি থাকা এবং সত্যাশ্রয়ী হওয়া-এই পাঁচটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ। অহিংসা আচরণ তখনই সম্ভব, যখন আমরা সমদর্শী হব অর্থাৎ সকল মানুষকে নিজের মতো মনে করব। (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৬/৩২)।
মনুসংহিতার মতে ধর্ম হচ্ছে কতগুলো গুণের সমষ্টি। উক্ত হয়েছে-
“ধৃতিঃ ক্ষা দমোহস্তেয়ং
শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো
দশকং ধর্মলক্ষণম্ ॥” (মনুসংহিতা, ৬/৯২)
অর্থাৎ সহিষ্ণুতা (ধৈর্য), ক্ষমা (ক্ষমাশীলতা), আত্ম-সংযম, চুরি না করা (পরস্ব অপহরণ না করা), শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, শুদ্ধবুদ্ধি (প্রজ্ঞা), বিদ্যা (জ্ঞান), সত্য এবং অক্রোধ (ক্রোধহীনতা) এই দশটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ।
এই দশটি গুন যিনি যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারেন তাঁর মধ্যে মানুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। এ আলোকে হিন্দুধর্ম কোন বিশেষ স্থান, কাল, জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে ধর্মাচরনের বিধান দেয় নি। সকল দেশের, সকল কালের, সকল মানুষের পক্ষে যা কল্যাণকর সেটিই হচ্ছে হিন্দুধর্মের নির্দেশনা। হিন্দুধর্ম বহু মত ও পথের সমন্বয়ে সৃষ্টি। অদ্বৈতবাদী, দ্বৈতবাদী, একেশ্বরবাদী, আস্তিক, নাস্তিক, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি বিভিন্ন ধারার বিশ্বাস মত ও পথ এর ধর্মদেহে লীন হয়েছে একান্তভাবে। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন- ‘যত মত তত পথ’। ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান’-এটাই হিন্দুধর্মের মূল চেতনা। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তা এখানে স্বীকার্য। মানবিক মূল্যবোধে, মানবিক কল্যাণে যা কিছু তা এখানে গ্রহণীয়। এটা কেবল সম্ভব মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বিভিন্ন মত ও পথের প্রতি সীমাহীন সহিষ্ণুতা ও প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ থেকে। হিন্দুধর্মের এই যে ঔদার্য, বিশালতা, মানবিক বিকাশের ধারা এবং তার অন্তরের সঞ্জীবনী শক্তি তা নিঃসন্দেহে নন্দিত।
হিন্দুধর্ম বিশ্বাসে কেবল সর্বজনীন সহনশীলতাই নেই বরং এখানে একটা দৃঢ় প্রতীতি আছে যে পৃথিবীতে যদি কোনো একটি ধর্ম সত্য হয় তাহলে অন্য ধর্মগুলোও সত্য। সকল ধর্মে, সর্বকালে এবং সব দেশেই হতে পারে অবিনাশী বাণীর উচ্চারণ ও মহিমান্বিত পুরুষের আবির্ভাব। হিন্দুধর্মের মানবিক ঔদার্য্য, চিন্তার প্রসারতা, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি বিচার বিশেষণ করে একে যদি কেউ বলে ‘মানবধর্ম’ তাহলেও অত্যুক্তি হবে না।
হিন্দুধর্মের প্রধান দিক সকল জীবের মধ্যে ঈশ্বর দর্শন, সকলকে ভালোবাসাই ধর্ম- এই চেতনাটি বীর সন্ন্যাসী বিবেকান্দের ভাষায় প্রতিফলিত হয়েছে অনুপমভাবে-
“ব্রহ্ম হতে কীট-পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মনপ্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে এ সবের পায়।
বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন ও সাম্যের বাণী প্রচারই হিন্দু ধর্মে মূল লক্ষ্য। বেদ, উপনিষদ, রাময়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সহ প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই জীবের প্রতি ভালোবাসার কথা, মানবকল্যাণের কথা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাম্যের (শান্তির) বাণী প্রচারিত হয়েছে। উক্ত হয়েছে-
“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম॥
এম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ”।
(শ্রীমদ্বদ্গীতা, ৪/১১)
অর্থাৎ ‘হে পার্থ’ যে আমাকে যেভাবে উপাসনা করে, আমি তাকে যেভাবেই তুষ্ট করি। মনুষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথের অনুসরণ করে’।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী মহাপুরুষগণের ধর্মচিন্তার প্রধানভিত্তি মানবতাবাদ। তাঁরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখতেন এবং সকল ধর্মের মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসতেন। লোকনাথ ব্রক্ষচারী বলেছেন-
“ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য এসবই
জগতের ব্যবহারিক সত্য, মনের
সৃষ্টি। আমি যে জগতের লোক
সেখানে নেই কোনো ভেদ, সেখানে
সবই সমান-সবই সুন্দর”॥
অর্থাৎ ‘তোমরা সংযুক্ত হও, একবিধ বাক্য প্রয়োগ কর, তোমাদের মনসমূহ জ্ঞাত হোক সমানরূপে। তোমাদের সংকল্প সমান, তোমাদের হৃদয়সমূহ সমান এবং সমান হোক তোমাদের আন্তঃকরণসমূহ। যাতে তোমাদের পরম ঐক্য হয়, তাই হোক’।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “যুদ্ধ নয়, সহমর্মিতা; ধ্বংস নয়,সৃষ্টি; সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতি’। তিনি আরো বলেছেন ‘বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি’। বস্তুত: বিশ্বশান্তির জন্য প্রয়োজন হিন্দুধর্ম প্রস্ফুটিত মহান ঐক্য ও সম্প্রীতির বাণী মনেপ্রাণে ধারণ করে কাজ করা।
ওঁ শান্তি (ওম্ শান্তি)- এতো সকল মানুষের জন্যই শান্তি কামনা, কাউকে বাদ দিয়ে নয়। এটি হিন্দু ধর্মের সার্বজনীন সদ্ভীব ও সম্প্রীতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরন।

বৌদ্ধ ধর্ম
আজ থেকে আড়াইহাজার বছর পূর্ব জন্মালাভকারী মহামানব গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত ধর্ম বৌদ্ধধর্ম নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মানবসভ্যতায় ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবিক সাধনার এক অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত বুদ্ধজীবন। বুদ্ধের চিন্তা-চেতনা ও কর্মের মধ্যে মানবের কল্যাণ প্রকৃষ্টভাবে দেখা যায়।

বুদ্ধ লোভ-দ্বেষ-মোহ পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন। মানুষের কল্যাণ, সুখ-শান্তি, দুঃখমুক্তির কথা বলেছেন। তিনি সকল মানুষকে এক এবং অভিন্ন করে দেখতেন। তিনি ধর্মপ্রচার করার সময় তাঁর শিষ্যদেরকে উপলক্ষ্য করে বলেছিলেন; ‘হে ভিক্ষুগণ! বহুজনের সুখের জন্য, বহুজনের মঙ্গলের জন্য তোমরা দিকে দিকে বিচরণ করো, এমন ধর্ম দেশনা করো যার আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ (মহাবর্গ পৃ.২২)। বুদ্ধের এই বাণী চিরন্তন এবং চিরশ্বাশত। এখানে বুদ্ধ সকল সম্প্রদায়ের সুখ ও মঙ্গলের কথা বলেছেন। সকলের কল্যাণের কথা বলেছেন। পারস্পরিক সদ্ভাব-সম্প্রীতির কথা বলেছেন।
বুদ্ধ মানুষে মানুষে এমন কি নারী-পুরুষে ভেদাভেদ করেননি। তিনি সাম্যেও ধারণা দিয়েছেন। তাঁর ধর্মে নেই কোন জাত-অজাতের অভিমান। তিনি বলেছিলেন: গঙ্গা, যমুনা প্রভৃতি বড় বড় নদী যেমন সমুদ্রে মিলে স্বতন্ত্র সত্তা ও নাম হারিয়ে অনুরূপভাবে ব্রাক্ষন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্রসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ ভিক্ষু-সঙ্ঘে স্থান পায়। তিনি ছিলেন রাজপুত্র। তিনি ধনী-গরীব, উচু-নীচু সবাইকে ভালোবাসতেন। শুধু তাই নয়, সকলকে তাঁর ধর্মে অংশ গ্রহন করারও সুযোগ করে দিতেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্যে শান্তিময় জীবনযাপন প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন: ‘বৈরীদের মধ্যে বৈরীহীন হয়ে, হিংসাকারীদের মধ্যে অহিংস হয়ে সুখে জীবনযাপন করো’। (ধর্মদপ/গাথা সংখ্যা,১৯৭)। মৌমাছি যেমন ফুলের বর্ণগন্ধ ও আকৃতি বিনষ্ট না করে শুধু মধু আহরণ করে, তেমনি মানুষকেও সমাজে কারো ক্ষতি বা অনিষ্ট না করে শুদ্ধভাবে জীবনযাপন করা উচিত। তিনি আরো বলেন: ‘খারাপ চরিত্র সম্পন্ন ব্যাক্তির নিন্দা ও অকীর্তি প্রচার হয়। গুণী, পন্ডিত, বিনয়ী ব্যাক্তির প্রশংসা ও গুণকীর্তি অর্জন লাভ করে’ (থের গাথা, পৃ.৩৬২)। এখানে তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সলকে উপলক্ষ্য করেই এই উপদেশ প্রদান করেছিলেন।
সংযমের মাধ্যমে পরিচালিত চিত্তই সবাইকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ বলেন; ‘বৈরী বৈরীর বা শত্র“র শত্র“র যে অনিষ্ট সাধন করে, বিপথে পরিচালিত চিত্ত তাঁর চেয়ে অধিক অনিষ্টকারী হয়’ (ধর্মপদ, গাথা সংখ্যা ৪২)। এখানে চিত্ত সংযমের কথা বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে সকল প্রকার সম্প্রীতি-সদ্ভাব বিনষ্ট হওয়ার পেছনে এই মন বা চিত্তই প্রধান ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বুদ্ধ, মনকে সংযত করার কথা বলেছেন।

বিশ্বে কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় বৌদ্ধধর্ম তার নির্দেশনা রয়েছে। শুধু মানুষ নয়, যে কোনো প্রাণীর প্রতি হিংসা করা ও পাপ। বুদ্ধবাণীর মূল কথা হলো অহিংসা, সর্বজনীন শান্তি, মৈত্রী, পরমতসহিষ্ণুতা, উদারতা। এই উপদেশগুলো সর্বকালের এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য।
লোভ-দ্বেষ-মোহের কারণে মানুষ মানসিক এবং শারীরিক অশান্তি, দুঃখ, যন্ত্রণা পায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধের ‘অহিংসা পরম ধম্ম’ ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। শান্তি বিনষ্টকারী সকল প্রকার প্রচেষ্টা ও কার্যকলাপ বৌদ্ধধর্মে নিশিদ্ধ। বুদ্ধের নিষিদ্ধ পঞ্চ বানিজ্যেও মধ্যে মদ, বিষ, মৎস, প্রাণী এবং অস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:
সব্বে তসন্তি দন্ডস্স সব্বেসং জীবিতং পিয়ং
অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয়্য ন ঘাতয়ে। (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা, ১২৯)
অথাৎ, ‘সকলেই দন্ডকে ভয় পায়। কেননা, জীবন সকলের প্রিয়। নিজের সাথে তুলনা করে কাউকে আঘাত বা হত্যা করবে না’। বুদ্ধ অস্ত্র বা শক্তির জয় অপেক্ষা আত্মজয়কে শ্রেষ্ঠ জয় বলেছেন। তিনি বলেন: ‘যিনি যুদ্ধে হাজার বার হাজারো মানুষকে জয় করেন তার সেই জয় অপেক্ষা যিনি একমাত্র নিজেকে জয় করেছেন তিনিই শ্রেষ্ঠ বিজয়ী’। বুদ্ধ আরো বলেন: ‘অক্রোধের দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, সাধুতা দ্বারা অসাধুকে জয় করবে, সত্যের দ্বারা মিথ্যাকে জয় করবে, ত্যাগ দ্বারা কৃপণকে জয় করবে’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/৫)। বুদ্ধের অন্যতম শিক্ষা হলো ‘জগতে শত্র“তার দ্বারা শত্র“তার কখনো প্রশমিত হয় না। শত্র“তাহীনতার দ্বারাই শত্র“তা উপশম হয়’ (ধর্মপদ গাথা, সংখ্যা/২২৩)।

সুত্র নিপাত নামক গ্রন্থের ‘মৈত্রী সূত্রে’ উক্ত হয়েছে: ‘কেউ কাকেও বঞ্চনা করবে না। ছোট-বড়, উত্তম-অধম বলে কাকে অবজ্ঞা করবে না, ক্রোধ বা হিংসা করবে না, কেউ কারো দুঃখ কামনা করবে না। মা যেমন নিজের জীবনের বিনিময়ে তার একমাত্র সন্তানকে রক্ষা করেন তদ্রুপ সকল প্রাণির প্রতি অপরিমেয় মৈত্রী পোষণ করবে’ (পৃ.৩৬)। আদর্শ সমাজ, পরিবার, উন্নত জীবনগঠন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিশ্বশান্তি ও ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ়করণে বুদ্ধবাণী অপরিহার্য।

সব্বে সত্তা সখিতা অর্থাৎ: ‘সকলের মঙ্গল হোক, কল্যাণ হোক’। বুদ্ধের এই অমোঘ বাণী সকল সম্প্রদায়ের, সকল মানুষের জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক অসাধারণ বাণী।

খ্রিস্টধর্ম
পবিত্র বাইবেল ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে মানুষের আচরণের প্রধান চালিকাশক্তি হলো ধর্ম। প্রকৃত ধর্মের প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে মানুষের কর্মে, অপর মানুষের প্রতি তার আচরণে। ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য সৃষ্ট হয়নি। বাইবেলে প্রবক্তা মীমা প্রকৃত ধর্মের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “ ঞড় ধপঃ লঁংঃষু, ষড়াব ঃবহফবৎষু ধহফ ধিষশ যঁসনষু নবভড়ৎব এড়ফ.” অর্থাৎ ধর্ম হলো ‘ন্যায় সঙ্গতভাবে কাজ করা, কোমল হৃদয়ে ভালবাসা এবং বিনম্রচিত্তে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে যাওয়া’।

বাইবেলের আদি পুস্তকে মানব পরিবারের যাত্রা শুরুর কথা বলা হয়েছে: ‘ঈশ্বর তাঁর মূর্তিতে আপন ‘সাদৃশ্যে’ মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের পুরুষ ও নারী করেই সৃষ্টি করলেন। ঈশ্বর মানুষকে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমরা প্রজাবন্ত হও ও বংশ বৃদ্ধি কর”। (আদিপুস্তক ১:২৬-২৭)। এভাবে পরিবার মিলন, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনে একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ বিনির্মিত হয়েছে।
খ্রিস্টধর্ম মতে, জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেহেতু মানুষ, সবার জীবনের উৎস যেহেতু এক ও অভিন্ন সকলের সৃষ্টিকর্তাও যেহেতু মাত্র একজন, তাই সকল মানুষই এক মানব পরিবারের সদস্য-সদস্যা। বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিষ্ঠাতা কোন নিদিষ্ট জনগোষ্টিার নয়, অধিপত্যবাদেও স্থান ধর্মে নেই। রয়েছে সার্বজননীনতা।

‘নতুন বিশ্ব’ বাইবেলের ভাষায় নতুন স্বর্গ ও নতুন পৃথিবী, যেখানে ‘মানুষেদের মাঝখানে পরমেশ্বরের আবাস। তিনি তাদের সঙ্গে বসবাস করবেন; তারা হবে তাঁর আপন জাতি। স্বয়ং পরমেশ্বর তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবেন; তিনি হবেন তাদের আপন ঈশ্বর, তাদের চোখ থেকে মুছিয়ে দেবেন সমস্ত অশ্র“জল। তখন মৃত্যু আর থাকবে না, থাকবেনা আর শোক, আর্তনাদ, দুঃখ যন্ত্রণা’ (প্রত্যাদেশ ২১, ৩খ-৪ক)
বাইবেলে বর্ণিত ঐশি বিষয়াবলি বিশ্লেষণ করে ১৯৬৫-এ দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভায় (ঠধঃরপধহ ঈড়ঁহপরষ ১১) ‘অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর (ঈযঁৎপয) সম্পর্ক বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ -এ বলা হয় যে, ‘সব মানুষ মিলেমিশে একটি সমাজ গঠিত হয়, কারণ সব মানুষ এসেছে একই উৎসমূল থেকে যা ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন সারা পৃথিবীটাকে মানুষের বাসভূমি করার জন্য। সব মানুষ একই গন্তব্যের দিকে তথা ঈশ্বরের দিকে ধাবিত। ঈশ্বরের তত্ত্বাবধান, তার সুস্পষ্ট উত্তমতা ও ত্রাণমূলক পরিকল্পনা সকল মানুষের জন্য পরিব্যপ্ত; সকল মানুষ পূণ্য নগরীতেই একত্রিত হবে’। এ আলোকে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়কে স্বীকার করে এ-ঘোষণায় বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিরাজমান অন্যান্য ধর্ম নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক বিধান ও পূর্জা অর্চনার মাধ্যমে জীবন যাত্রার সুবিন্যস্ত প্রণালী উদ্ভাবন করে নিজ নিজ উপায়ে চেষ্টা করে থাকে মানব হৃদয়কে শান্ত করার জন্য। মানুষে মানুষে, এমনকি জাতিতে জাতিতে একতা ও ভালবাসা লালন করার জন্য খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কী কী বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করা যায় তার প্রতি গুরুত্বরোপ করা হয়। সবশেষে সকল খ্রিস্টভক্তদের প্রতি আহবান জানানো হয় যেন তারা তাদের বিশ্বাস ও জীনবযাত্রার সাক্ষ্য দিতে দিতে অখ্রিস্টানদের মধ্যে বিরাজমান আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্যগুলো এবং তাদের সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতি যেন স্বীকার, সংরক্ষণ ও উৎসাহিত করেন।

ভালবাসা খ্রিস্ট ধর্মমতের এক মৌলিক শিক্ষা। ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এতই নির্ভরশীল যে, পবিত্র শাস্ত্র বলে, “যে ভালবাসেনা, সে পরমেশ্বরকে মানে না”। পূণ্য প্রেরিত পিতর ও পলের অনুসরণ করে ভাতিকান সহাসভা খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসীদের অনুরোধ জানায় যেন বিধর্মীদের প্রতি তারা সদাচরণ করে চলেন এবং নিজেদের পক্ষ থেকে সব মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করে স্বর্গীয় পিতার সত্যিকার সন্তান হয়ে উঠেন। (দ্বিতীয় ভাতিকান মহাসভা “অন্য ধর্মসমূহের সঙ্গে মন্ডলীর সম্পর্ক বিষয়েক ঘোষণাপত্র”, ২৮ অক্টোবর, ১৯৬৫)।
প্রয়াত পোপ দ্বিতীয় জন পল-এর ভাষায়, “চবধপব ফবসধহফ ধ সবহঃধষরঃু ধহফ ধ ংঢ়রৎরঃ যিরপয নবভড়ৎব ঃঁৎহরহম ঃড় ড়ঃযবৎং, সঁংঃ ঢ়বৎসবধঃব যরস যিড় রিংযবং ঃড় নৎরহম ঢ়বধপব. চবধপব রং ভরৎংঃ ধহফ ভড়ৎবসড়ংঃ ঢ়বৎংড়হধষ, নবভড়ৎব রঃ রং ংড়পরধষ. অহফ রঃ রং ঢ়ৎবপরংবষু ঃযরং ংঢ়রৎরঃ ড়ভ ঢ়বধপব যিরপয রঃ রং ঃযব ফঁঃু ড়ভ বাবৎু ঃৎঁহ ভড়ষষড়বিৎ ড়ভ ঈযৎরংঃ ঃড় পঁষঃরাধঃব”. এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ এর ৩-৪ জুলাই ‘মুসলমান-ক্যাথলিক যোগাযোগ কমিশন’ – এর উদ্যোগে ‘বিশ্বায়ন যুগে ধর্ম ও সভ্যতার সংলাপ’ শীর্ষক আলোচনায় পরিসমাপ্তিতে এক যুক্ত ইশতিহারে বিশ্বায়নের গুরুত্ব ও শুভফল স্বীকার করে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয় কতিপয় ভয়ঙ্কর দিকের কথা ‘যা সর্বজন স্বীকৃত ও ন্যায্য নীতিমালা প্রণয়নে, ধর্মরে প্রতি সম্মান এবং মানুষের কৃষ্টিগত মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সাথে বাধা ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে’। পরিশেষে মুসলমান ও ক্যাথলিক যৌথ কমিশন একমত হয়ে বলেছেন যে, সংলাপের কৃষ্টি গড়া, ভোগবাদের প্রতিরোধ করা উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং সকল প্রকার বৈষম্য বর্জন করার জন্য তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।

উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশের তথা বিশ্বের প্রধান ধর্মসমূহের প্রতিটির মৌলিক দর্শন এক ও অভিন্ন। আর তা হলো অহিংসা, ভালবাসা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ধারণা। মানবজাতি এখানে মূল উপজীব্য। মানব প্রেম ও মানব কল্যান সাধন সকল ধর্মের মূল-শিক্ষা। মানবতাবাদী চেতনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনেই ধর্মের সাফল্য নিহিত। ভারতবর্ষে এ আদর্শের ব্যতায় অবলোকন করে বিশ শতকের ত্রিশের দশকে হিন্দু মুসলমান প্রবন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন: “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাধনে তাকে বাঁধতে পারেনা, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটিকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে, রাষ্ট্রিক স্বার্থবৃদ্ধি কি সে দেশকে বাঁচাতে পারে?’ (‘হিন্দু মুসলমান ২’, কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী, (স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সম্পাদিত), দ্বাদশ খন্ড, ঐতিহ্য সংস্করণ, জানুয়ারী ২০০৪, পৃ.৭০৬)।
বস্তুত: হোমো, স্যাপিয়েন্স লিন (ঐড়সড় ংধঢ়রবহং খ) পরিবারের সদস্য হিসেবে মানবতাবাদী চেতনার সূত্রে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সদ্ভাব বজায় রাখাই হলো সকল ধর্মের মূল শিক্ষা।

This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

No Comments