ইলমে হাদীসের মহান সম্রাট ইমাম বোখারী (রাঃ) —-দর্পণ ডেস্ক

ইলমে হাদীসের মহান সম্রাট ইমাম বোখারী (রাঃ)—-দর্পণ ডেস্ক

কোরআন- হাদীসের নীতি ও আদশকে শধু মুখের বুলিতে আবদ্ধ না রেখে তিনি সমাজের সর্বস্তরে কোরআন হাদীসের বাস্তব এবং প্রত্যক্ষ ষ্শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কোরআন শরীফে আল্লাহপাক এরশাদ করেছেনঃ
হে মানবকজাতি ! স্বীয় প্রতিপালকের ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁরই থেকে তার জোড়া (সঙ্গিনী) সৃষ্টি করেছেন; আর এ দুজন থেকে বহু নর- নারী বিস্তার করেছেন। (সূরা নিসা, আয়াত নং-১)
উপরোক্ত আয়াতের নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করলে একজন মুসলমান কখনো অধার্মিক ও মানবতাবিরোধী কোন কাজ করতে পারে না। কেননা মূলতঃ পৃথিবীরন সকল মানষুই আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) থেকে উদ্ভুত । ১৮ বছর বয়সে কাযাইয়া সাহাবা ওয়াত তাবেয়ীন নামক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি হিজাজে ৬(ছয়) বছর জ্ঞান সাধনায় কাটিয়ে স্বদেশ ফিরে আসেন। ইমাম বোখারী নিজেই বর্ণনা করেন যে, তখন ইমাম আবু হানিফা (রাঃ) এর শিষ্য আবদুল্লাহ ইবনুল মোবারক ওকী এর সমস্ত কিতাব সমূহ আমার মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। অতঃ পর তারিখে কবীর” নামক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। বুস্তানুল মোহাদ্দিস নমক গ্রন্থে ঘটনাটি বর্ণনা হয়েছে।
ইমাম বোখারী (রাঃ) অসাধারন স্মৃতির অধিকারী ছিলেন । তিনি নিজেই বলেছেন যে, তার এক লাখ সহীহ বিশুদ্ধ এবং দু লাখ গায়রে সহীহ হাদীস মুখস্ত ছিল। তাঁর এ অস্বভাবিক ও বিস্ময়কর স্মৃতি শক্তির খবর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন শহরের মুহাদ্দীসগন তাঁর স্মৃতি শাক্তির পরীক্ষা করে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছেন। সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন যে, হাদীস শাস্ত্রে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। ইমাম বোখরী (রাঃ) এর সহস্রাধিক ওস্তাদ ছিল। তাঁর প্রসিদ্ধ ওস্তাদের নাম নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ
(১) মক্কী ইবনে ইব্রাহীম (রাঃ)। (২) ইব্রাহীম ইবনে মুনয়ের (রাঃ)
(৩) মুহাম্মদ ইবনে মক্কী ইউসুফ (রাঃ) (৪) ইমাম হুমাইদী (রাঃ)
(৫) আবাদ ইবনে আবি আয়াস (রাঃ) (৬) আহমদ ইবনে হাম্বাল (রাঃ)
(৭) আলী ইবনে মাদানী সালাম (রাঃ) (৮) আলী ইবনে মাদানী (রাঃ)
(৯) ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রাঃ) (১০) আবদুল্লাহ ইবনে মুসা (রাঃ)
(১১) আবদুল্লাহ ইবনে সালেহ (রাঃ)

তাঁর ছাত্রবৃন্দ ইমাম বোখারী (রাঃ) থেকে বুখারী শ্রবণকারীর সংখ্যা ৯০ হাজারেরও অধিক বলে বর্ণনা করা হয়েছে তাদের মধ্যে কয়েক জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
(১) আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ (রাঃ) (২) আবু ঈসা ইমাম, তিরমিযী (রাঃ) (৩) আবু আব্দুর রহমান নাসাঈ (রাঃ) (৪) আবু হাতেম (রাঃ) (৫) আবু জোয়রা (রাঃ)।

উল্লেখ্য যে, ইমাম বোখারী (রাঃ) যাদের নিকট হতে হাদীস সংগ্রহ করেছেন তাদের সঠিক সংখ্যার নির্ণয় অনেকাংশেই অসম্ভব। তবে ইমাম জাফর ইবনে মোহাম্মদ (রাঃ) বর্ণনায় তাদের সংখ্যা এক হাজারের অধিক।
বোখারী শরীফ রচনায় ইমামের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও শিষ্ঠাচারিতাঃ
এ পর্যন্ত যত হাদীস গ্রন্থ রচিত হয়েছে সব গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয় হাদীসে রসূল(দঃ)। সে দৃষ্টিকোণ থেকে সকল কিতাবকে আল্লাহর কিতাব বলা হয় । গ্রন্থকার স্বরচিত কিতাবকে বলা হয় রাসূলের কিতাব আর রাসূল সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহিস সালাম বোখারী কিতাবকে আমার কিতাব বলা হয় এক কথা নয়। গ্রন্থকারের দাবী অনুযায়ী আল্লাহর রাসূলের অনেক কিতাব থাকতে পারে। কিন্ত রাসূলের দাবীকৃত তাঁর কিতাব একমাত্র আল-জামিউস সহীহিল বোখারী। বোখারী শরীফ সম্পর্কে আল্লাহর হাবীবের এই স্মরণীয় অভিব্যক্তি শুধু হাদিসের কিতাব কিংবা এর রচনা শৈলীর কারণে নয়। বরং আল্লাহর রাসূলের প্রতি ইমাম বোখারীর অতুলনীয় ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালবাসা যার কারণে তিনি বোখারী শরীফ গ্রন্থগার ক্ষেত্রে সর্বেচ্চে সতর্কতা শিষ্ঠাচারিতা ও শালীনতা রক্ষায় এক মুহুর্তের জন্যও উদাসীন ছিলেন না। তিনি দীর্ঘ ষোল বৎসর অক্লান্ত পরিশ্রম করে মক্কাতুল মোক্কারমা, বসরা ও বোখারায় অবস্থান করে ছয় লক্ষ হাদীসের উপর গবেষণা চালিয়ে কয়েক হাজার হাদীসকে নিয়ে বোখারী শরীফের প্রথম খসড়া কপি তৈরী করেন। অতঃপর আরো গভীর অনুসন্ধান ও যাচাই করে হাদিসের সনদ ও মত সম্পর্কে প্রাথমিকভারে নিশ্চিত হয়ে ২য় পান্ডুলিপি তৈরি করেন মসজিদুল হারামে বসে। ৩য় ও শেষ বার মূল কপি তৈরির জন্য ইমাম মদিনাতুর রাসূলে উপস্থিত হয়ে রাওজায়ে আকদাসের পাশে বসে প্রতিটি হাদীসে আল্লাহর রাসূলের নিকট দরূদ পাঠ করতেন। যে হাদীসের ব্যাপারে সরাসরি অথবা স্বপ্নযোগে হাদিসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে রাসূল (দঃ) সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করতেন সে হাদীসটি মূল সংকলন লিপিবদ্ধ করার পূর্বে গোসল করতেন। অতঃপর দুই রাকআত নফল নামাজ আদায় করতেন তারপর হাদীসটি লিখতেন। কোন কোন বর্ণনাকারীর মতে মসজিদুল হারামে অবস্থান করে মূল কপিতে হাদীস লিপিবদ্ধ করার পুর্বে জমজমের পানি দিয়ে গোসল করতনে। অতঃপর হেরেম শরীফে দুই রাকআত সালাতুল ইস্তিখারা আদায় করে হাদীস খানা লিখতেন। এভাবে বোখারীর মূল কপি মক্কা শরীফে তৈরী করে মদীনায়ে মনোয়ারায় রাওযায়ে আকদাসে বসে তারাজমি আবওয়াব লিখেছেন। এই বর্ণনা মতে বুঝা যায় যে, বুখারী শরীফের মূল সংকলন তৈরীর পূর্বে একটি মাত্র খসড়া তৈরী করা হয়েছিল। কিন্ত ইমাম বোখারী রাহমাতুল্লাহি তা’আলা আলায়হি এর অন্যতম ছাত্র মুহাম্মদ ইবনে আবি হাতেম আল ওয়াররাক বর্ণনা করেন আমি ওস্তাদজী (ইমাম বোখারী) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আল জামিউস সহীতে যে হাদীসগুলো আপনি লিপিবদ্ধ করেছেন সব হাদীস কি আপনার স্মরণে আছে? এর উত্তরে ইমাম বলেছেন; আল জামিউস সহীর কোস হাদীস আমার অজানা নয় কারণ এই হাদীসগুলোকে আমি তিনবার লিখেছি। এ দ্বারা বুঝা যায় ইমাম বোখারী রাহমাতুল্লাহি তা’আলা আলায়হি বোখারী মূল কপি তৈরীর প্রর্ব দুটি খসড়া কপি তৈরী করার মতটি াধিকতর নির্ভরযোগ্য বলে গবেষণা মনে করেন। বোখারী শরীফের কপিগুলোত কোন কোন ক্ষেত্রে (অধ্যায় লিখে শিরোনাম না লেখা এবং শিরোনাম লিখেও কোন হাদীস উল্লেখ করার মত) গরমিল হয়তো এ কারণেই হয়ে থাকতে পারে।
[ হাদিয়ূস সারী, আশিয়াপতুল লোমআত, তাযকিরাতুল মোহাদ্দেসীন]
বোখারী শরীফের মূল পরিচয় এই কিতাক রাসূলুল্লা (দঃ) । এ পর্যায়ে আল্লাহর মহান অলী হযরত আবু যাঈ মরুযী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এর স্বপ্নটি বিশেস তাৎপর্যপূর্ণ। হযরত আবু সাহাল মুহাম্মদ ইবনে আহমদ মরুযী হতে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত তিনি বলেন- হযরত আবু সাঈদ মরুযীকে বলতে শনেছি যে আমি ক্বাবা শরীফের হজরে আসওয়াদ ও মোকামে ইব্রাহীমের মধ্যবর্তী স্থানে ঘুমাচ্ছিাম। এমতাবস্থায় স্বপ্নে হুজুরের (দঃ) দিদার নসিব হলো। হুজুর বললেন আবু যাইদ (ইমাম) শাফীর কিতাব আর কত পড়তে থাকবে? আমার কিতাব পড় না কেন? আমি সবিনয়ে জানতে চাইলাম ইয়া রাসূলুল্লাহ (দঃ) আপনার কিতাব কোনটি? তখন হুজুর এরশাদ করলেন আমার কিতাব জামি মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল তথা বোখারী শরীফ। (তাযাকিরাতুল মোহাদ্দেসীন) হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এর ইশকে এলাহী নিদর্শন ক্বাবা শরীফকে আল্লাহ পাক বাইতিয়” আমার ঘর বলার কারণে এই ঘরে মানুষের সম্মিলন কেন্দ্র ও শান্তির আলো হিসেবে বিশ্বাসীর লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। তদ্রুপ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইব্রাহীমের ইশকে রসূলের নিদর্শন বোখারী শরীফকে হুযুর ছাল্লাল্লাহ তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কিতাব উল্লেখ করায় এই কিতাব স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে জনপ্রিয়তার উচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। যাবতীয় বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠতম স্থানের অধিকারী কোরআনুল করিমের পরে এই হাদীস গ্রন্থের স্থান।
ইলমে হাদীসের এই মহান সম্রাট ইমাম বোখারী (রাঃ) ২৫৬ হিজরী শনিবার ঈদুল ফিতরের রাত্রে এশার নামাজের সময় ইহলোক ত্যাগ করেন।
পরিশেষে মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট দোয়া পেশ করছি যেন ইমাম বোখারীর (রাঃ) সুনজর প্রদ্যেক মুসলমানকে দান করেন। আমিন

This entry was posted in Uncategorized, লেখনী সমূহ. Bookmark the permalink.

No Comments