অসামপ্রদায়িক ঐক্যের মূর্ত প্রতীক মাইজভান্ডার দরবার শরীফঃ অধ্যাপক শাহ আহমদ নবী।

অসামপ্রদায়িক ঐক্যের মূর্ত প্রতীক মাইজভান্ডার দরবার শরীফঃ অধ্যাপক শাহ আহমদ নবী।

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ জাল্লাশানুহুর প্রতি এবং লাখো-কোটি দরুদ ও সালাম পেশ করছি পরাক্রমশালী ও দয়ালু আল্লাহর মহা সৃষ্টি আম্বিয়াকূল শিরোমণি ও রাহমাতুল্লিল আলামীণ হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর নূরানী দরবারে। আমার ভক্তিপূর্ণ ও অবনত মসতকে কদমবুসি জানাচ্ছি গাউছুল আযম শাহছুফী সৈয়দ মাওলানা আহমদ উল্লাহ (কঃ) মাইজভান্ডারী ও গাউছুল আযম ইউসুফে ছানী সৈয়দ মাওলানা গোলামুর রহমান বাবাভান্ডারী (কঃ) এর কদম কোবারকে। যাতে গাউছে ধনের “মাইজভান্ডার দরবার শরীফ” সম্পর্কে অধম দোয়া প্রার্থীকে উপযুক্ত জ্ঞান দান করেন। এ দরবার শরীফ উপমহাদেশের প্রধান আধ্যাত্মিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র এবং এটি কেবল একটি ত্বরীকা বা দর্শন, একটি পারলৌকিক সাধনা কিংবা একটি চেতনার নাম নয় বরং একটি মানবতাবাদী, অসামপ্রদায়িক এবং বিচার সাম্য মূলক সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রাম। অসামপ্রদায়িক ঐক্য এবং ইহ ও পারলৌকিক সাধনার মূর্ত প্রতীক। মাইজভান্ডার দরবার শরীফ’ এর স’গিত ও প্রাণ পুরুষ ত্বরীকার প্রবর্তক গাউছুল আযম শাহচুফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) ও ভ্রাতুস্পুত্র গাউছুল আযম ইউসুফে সানী সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভান্ডারী (কঃ) মাইজভান্ডারী দর্শনের পরিপূর্ণ রূপকার হিসেবে এ দরবার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সবধরনের গোড়ামী ও মানবতা বিরোধী অশুভ শক্তির বিরুদ্দে একটি সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বিপ্লব। ভৌগোলিক অবস’ানগত, ভাষাগত ও জাতীয়তার নিরিখে মাইজভান্ডার দরবার শরীফের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে। বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ইমামূল আম্বিয়া নূরে মোজাচ্ছম রসূলে করীম (দঃ) এর প্রচারিত শানি-র ধর্ম ইসলামের বাণীকে বিশ্ব মানবতার শানি-র জন্য বিবর্তনিক ধারায় তদ্বীয় খলিফা খোলাফায়ে মাইজভান্ডারী আওলাদে রাসূল (দঃ) বা তদ্বীয় উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে প্রিয়নবী (দঃ) এর বেলায়াত শক্তি বিতরণের মাধ্যমে ত্রাণ কর্তৃত্ব ও কর্ম কর্তৃত্ব (গাউছিয়ত ও কুতুবিয়ত) জারি রেখেছেন। সুক্ষ্মতর ও চূড়ান- বিশ্লেষণে কেবল মানুষ নয়, মহান আল্লাহর সৃষ্টি সকল জীবই বিচার সাম্যের প্রত্যাশী। মাইজভান্ডারী জীবন দর্শনের এ চেতনা একদিকে যেমন মানবতাবাদী মানুষকে করেছে তুমূল আলোড়িত, অন্যদিকে তেমনি মাইজভান্ডারী সঙ্গীতের সূর বিশ্ব সংগীত জগতকে করেছে প্রভাবিত। এ মাইজভান্ডারী দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে শাশ্বত মরমী বাংলার লোক সংস্কৃতির অবয়বে নূতন রঙে নতুন ঢঙে, নতুন সুরে ও রুপে আবির্ভূত রয়েছে বিশ্বের লৌক সংস্কৃতির সুবিশাল চত্বর। মাইজভান্ডার দর্শনে ধর্ম সাম্যের যে বক্তব্য, তার বাসতব প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় মাইজভান্ডারী ত্বরীকার প্রবর্তক শাহ সুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ)’র কর্ম কান্ডের ভেতরে। তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠি নির্বিশেষে স্ব-স্ব ধর্মে থেকে কাজ করার ও আল্লাহকে স্মরণ করার পরামর্শ দিতেন। সমপ্রদায়গত ভেদ বুদ্দির উর্দ্বে তার কর্মকান্ড সকল সমপ্রদায়ের মানুষকে দারুনভাবে প্রভাবিত করে। এ কারনে দেখা যায় ধীরে ধীরে মাইজভান্ডার দরবার শরীফ পরিণত হয়ে উঠে সকল ধর্মের মানুষের এক অপূর্ব মিলন কেন্দ্র রুপে। তাছাড়া হযরত কেবলা কাবার খলীফা নির্বাচনের প্রতিফলন সুস্পষ্ট । যেমন-হিন্দু মনমোহন দত্ত, কালাচান সাধ, কবিয়াল রমেশ শীল, বৌদ্ধ ধনঞ্জয় বড়-য়া, খ্রিষ্টান মাইকেল পেনারু প্রমুখকে আধ্যাত্ম অনুক’ল্য প্রাপ্ত সিদ্ধ পুরুষ হিসেবে পরিচিতি দান স’ান ও কালের বিচারে রীতিমত যুগানতকারী ঘটনা মাইজভান্ডারী দর্শনের সমন্বয় ধর্মী, বিশ্বমানবতার মিলন মন্ত্রের যে বীজ রোপন করেছিলেন হযরত গাউছুল আযম মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্‌ মাইজভান্ডারী (কঃ) তার তিরোধানের পর তারই ভ্রাতুস্পুত্র ও নয়নমনি ইউসুফে ছানী হযরত গাউছুল আযম সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভান্ডারী (কঃ) ফলে ফলে সুশোভিত করে বিশ্বব্যাপী পরিপূর্ণ বিকাশের ব্যবস’া করে যথাযথ রূপদান করেছেন। বিগত শতাধিক বছর ধরে এ দরবার শরীফ পাপী-তাপী, শোষিত, নির্যাতিত, মোহান্ধ, অবহেলিত, রোগাক্রানত, দিশেহারা ও পথহারা নীতিহারা এবং অভাবগ্রস’, দীনহীন মানবতার আশ্রয় স’ল, পদপ্রদর্শক, আল্লাহপাকের সন’ষ্টি অর্জনের উপায ও ধর্ম সাম্যের স’তি গেয়ে আধ্যাত্মিক লৌকিক, পারলৌকিক শানি-র ঠিকানা হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। এ দরবার শরীফে শায়িত আছেন গাউছুল আযম শাহসূফী হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজান্ডারী (কঃ) গাউসুল আযম ইউসুফে ছানী সৈয়দ গোামুর রহমান (কঃ) বাবাভান্ডারী। যুগল গাউছুল আযম সহ অসংখ্য আওলাদে রাসূল (দঃ) এর আউলিয়া স’ান হিসেবেও মহিমান্বিত। বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলিম, খৃষ্টান ও ইহুদী সমপ্রদায়ের জন্য তীর্থ স’ান। কিন’ মাইজভান্ডার দরবার শরীফ জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত। প্রাণের তাগিদে, ত্রাণের তাগিদে তাই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন মাইজভান্ডার দরবার শরীফে।
ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশ ভূ-খন্ডের বার আউলিয়ার পূণ্য ভুমি চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার দরবার শরীফ ধর্মের বাণী, প্রেমের বাণী ও ধর্ম সাম্যের নীতিতে প্রচারিত মাইজভান্ডারী দর্শনের এ উদার ও অসামপ্রদায়িক ঐক্যের মূর্ত প্রতীক বিশ্ববাসীকে বিতরণ করে যাচ্ছে অফুরনত খোদায়ী নিয়ামত। সর্বোপরি, সমন্বয়ধর্মী বক্তব্য বিশ্ববাসীর নিকট যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হলে বিশ্ব মানবতার ও সভ্যতার বিকাশের নতুন দিগনেতর দ্বার উম্মোচিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। দীর্ঘকাল ধরে সূফী সাধকদের অসমাপ্রদায়িক উদার মানবতাবাদী নীতি ও শিক্ষা বাঙালী জনজীবনের উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিসতার করে আছে, মাইজভান্ডার দরবার শরীফ তারই অন্যতম দৃষ্টানত। সূফী সাধকদের প্রবাহমান অবদানের ধারায় মাইজভান্ডার দৃষ্টি আকষণীয় ও উল্লেখযোগ্য হারে নতুন মাত্রার সংযোগ ঘটিয়েছে অসমপ্রাদায়িক কর্মকান্ড দ্বারা। তাই এ দরবার শরীফে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের এক মহামিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আমরা মানবজাতির বিশ্বাস ও ইগু সম্পর্কিত ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখতে পাই বিশ্বাসজনিত সংঘাতই ঐতিহাসিকভাবে এক চরম সংকট। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ক্রম:ধারায় স’ান-কাল, পাত্র ও বর্ণভেদে ভিন্ন ভিন্ন মত পার্থক্যগত বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে বিশ্বের কত লক্ষ-কোটি অধিবাসীকে অকালে প্রাণ দিতে হয়েছে? তার হিসাব বের করা কঠিন। এখনো মানুষ মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করছে না। বিশ্বাস জনিত নানা দ্বন্দে। রাহমাতুল্লিল আলামীন ইসলামী জিহাদ যুগে প্রতিটি যুদ্ধের সেনাপতিদের পবিত্র কুরলান ছুয়ে শপথ করাতেন যেন নিরীহ মানুষ হত্যা করা না হয়। (২) নারী ও শিশু হত্যা কোন অবস’ায় করা যাবে না। (৩) অসহায ও পঙ্গু ব্যক্তিদের কে হত্যা করা যাবে না। (৪) ধর্মের প্রতি চরম আঘাত না আনা পর্যনত বিধর্মী বা কাফেরদের প্রতি তলোয়ার চালানো যাবে না। (৫) ব্যক্তিগত আক্রোশে কাউকে অন্যায়ভাবে কতল করা যাবে না। (৬) ভূমি ধবংস, শস্যক্ষেত ধবংস বা উদ্ভিদরাজী তথা প্রকাৃতিক পরিবেশকে বিপন্ন করা যাবে না। (৭) খাদ্য ও পানীয় জল নষ্ট করা যাবে না। অথচ সমপ্রতি আমাদের দেশের সীমানত রক্ষীগণ বাতিল ইসলামী গ্রুপের সদস্য জেএমবিদের ন্যায় পৈশাচিক ও শতাব্দীর নির্মম হত্রা কান্ড পরিচালনা করে দেশের মেধাবী,ত চৌকস ও নিবেদিত প্রাণ সেনাবাহিনীর অসংখ্য কর্মকর্তাকে কিবাবে ব্রাশ ফায়ার করতে পারল? তাদের কি একটুও বুক কাপল না? কিসের স্বার্থে সুশৃংখল সেনা কর্মকর্তাদের অমূল্য জীবন ধবংশ করেছিল? নৈতিক মূর‌্যবোধ ও ধর্মের গুঢ় রহস্য সম্পর্কে তারা ওযাকিবহাল আছে কি? যে প্রাণী পিপড়া তৈরি করতে অক্ষম সে কিবাবে আল্লাহর সৃষ্টিকে তছনছ করতে চায়? আল্লাহপাক বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতিকে ইহুদী-নাসারা চক্রের ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করুন। আমিন। ধর্মের নামে, বর্ণের নামে, জাতীয়তার নামে সংস্কৃতির নামে বর্বরতাই অনাদিকাল থেকে আমাদের পৃথিবীকে অশানত ও বিপন্ন করেছে। হিংসা ও লোভের বিষাক্ত থাবায় বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি আদম সনতান হত্যার শিকার হয়েছে। তারা জীবন র্দনকে জানবার, বুঝবার কিংবা উপভোগ করার পূর্বেই ঘৃণার তপ্ত আগুনে নিঃশেস করেছে অগণিত প্রাণ। ধর্মগত বিশ্বাসে মানুষের মধ্যে দুই ধরনের সংঘাত রূপ ধারণ করে। যেমন-১. স্ব-স্ব র্ধরে কাঠামোর মধ্যে উপদলীয় কোন্দল ও হানাহানি। ২. নিজ ধর্মের প্রাধান্যতা ও অন্য ধর্মের প্রতি অজ্ঞতা প্রসূত অবজ্ঞা ও বিদ্বেষজনিত হানাহানি। ধর্মীয় পরিমন্ডল থেকে মানুষ নৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন। অথচ ধর্মীয় পরিমন্ডলেল অনতঃকলহ, পারস্পরিক ধর্মীয় প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় কৌলিন্যের সংঘাত সমগ্রভাবে মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রানে- দাড় করিয়েছে। ধর্মের এহেন সংঘাতময় পরিসি’তি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার একজন খোদায়ী ছিফাতধারী যুগ সংষ্কারক। যিনি রুপে, গুনে ও কর্মকান্ডে অতুলনীয় ও অনুসরনীয় এবং অনুকরণীয় গুনে গুনাণ্বিত হবেন। মাইজভান্ডার দরবার শরীফের প্রাণ পুরুষ, রূপকার, দিক-পাল ও সংস্কারক হিসেবে এং ত্রান কর্তৃত্ব ও কর্ম কর্তৃত্ব মত সম্পন্ন বুজর্গদের মধ্যেকার অসমপ্রদায়িক, ধর্ম সাম্য ও মানবতার রক্ষাকবচ নীতি বিশ্ববাসীকে দান করেছে অনুপম শানি- ও মানবিক গুনাবলী বিকাশের খনি। মহানবী (দঃ) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত রাসূল। ইসলাম ধর্ম শানি- ও মানবিক ধর্ম। আমাদের প্রিয়নবীজি কোন একক জাতি, সমপ্রদায় বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। আল্লাহ বারাক তা’য়ালা সমগ্র বিশ্ব মানবতার হেদায়েতের জন্য তাঁকে পঠিয়েছেন, তাইতো তিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমত বা আর্শীবাদ স্বরূপ। মানবজাতির জন্য রহমতের এ করুনাধারা তদ্বীয় বংশধর, ছাহাবী ও বেলায়েত প্রাপ্ত প্রতিনিধিগণ কর্তৃক বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের প্রতিটি আনাচে কানাচে পৌছানো হয় প্রিয়নবী (দঃ) এর বিদায় হজ্বের উদাত্ত আহ্বান। নির্দেশ ও সর্তককারী বানী প্রত্যেকের কর্ণ কূহরে হসতানতরের মাধ্যমে। অতঃপর পবিত্র মদিনা মনোয়ারা থেকে দূর দূরানে-, এবং প্রত্যত্ম অঞ্চলের সর্বসাধারনের নিকট সূফী সাধকগন কর্তৃক ইসলামের দাওয়াত প্রেরিত ও প্রচারিত হয়ে আসছে। ইসলামের চিরনতন বাণী, শ্বাশ্বত রূপকে সর্বসাধারণের নিকট অবিকৃতভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে পবিত্র সূফী সাধকেরা নির্মোহ ও নৈব্যিকৃতকভাবে যুগ যুগ ধরে ঐতিহাসিক গুরু দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তারা পরিবর্তিত পরিসি’তির প্রেক্ষাপটের সাথে সাথে সামঞ্জস্য রেখে স’ান, কাল ও পাত্র ভেদে প্রয়োজনে নতুন আঙ্গিকে, নতুন সূরে ধর্মের সার্বজনীন বানীকে জনসম্মুখে তুলে ধরেন নিরলস ও নিরবিচ্ছিন্নভাবে এবং রুহানী শক্তি দিয়ে। সূফীগনের গুরুত্বপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সুমহান ধারায় মক্কা-মদিনার পবিত্র ভূমি থেকে মধ্য প্রাচ্য হয়ে গাউছুল আযম শায়খ সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানী আল হাসানী ওয়াল হোসাইনী (রাঃ) থেকে ভারত বর্ষে সূফীদের ধারা এসে স’ানীয় প্রেক্ষাপট নতুন আঙ্গিকে, উপস’াপনার কায়েদার, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। আজমীর শরীফে হিন্দেল আলী আতায়ে রাসূল গরীবে নেওয়াজ খাজা মইনুদ্দীণ চিশ্‌তী (রঃ) এ ধারায় বাংলাদেশে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রঃ), হযরত শাহ পরান (রঃ) চট্টগ্রামে বার আউলিয়াসহ অসংখ্য সূফী সাধকের আগমন ঘটে। কয়েক শতাব্দী ধরে চট্টগ্রামের মাটিতে এ সমসত সূফী সাধকদের উপসি’তি, সাধনা, ওফাতের পর তাদের মাজার শরীফকে কেন্দ্র করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নতুন যাত্রা যোগ হয়ে চট্টগ্রামের লোক সাহিত্যের ঐতিহ্রের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার দরবার শরীফের মাহত্ন শরাফত সূফীবাদের ইতিহাসে যুগানতকারী ও এক বিপ্লবী রূপানত্মরের সূচনা করে। যেমন যেমন ধর্মগত বা জাতিগত বিভাজন নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিমেষে সকল মানুষকে এক সৃষ্টি কর্তার বিশ্বাসী সকল আদম সন-ানকে একই পতাকাতলে সমবেত করার বক্তব্য নিয়েই শুরু করে মাইজভান্ডারীয়া ত্বরীকা ও দর্শন। এ দর্শণ ও ত্বরীকার প্রবর্তক গাউছুল আজম শাহছুফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) এর নিকট প্রথম জীবনে বিভিন্ন ধর্মাবলীর লোকজনের আগমন ঘটলে, ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার ইচ্ছা পোষণ করলে তিনি বলতেন স্ব-স্ব র্ধমে থাকুন নিজ নিজ ধর্মে থেকে সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করুন। ধনঞ্জয় বড়-য়া নামক একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভক্ত জাহেরী জবানীতে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে চাইলে হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী (কঃ) বলেছিলেন “তুমি তোমার ধর্মে থাক! আমি তোমাকে মুসলমান বানালাম।” সচরাচর আমরা যা দেখি তা হল একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ধর্মীয়, নৈতিক ও মানসিক প্রশানি-ও অন্বেষণে মন্দিরে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বৌদ্ধ মন্দিরে, খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী গীর্জায় ও মুসলিম ধর্মাবলম্বী কেবল মসজিদে গমন করে পবিত্রতা অর্জন করার লক্ষ্যে। পক্ষান-রে বল প্রয়োগ করেও একজন মুসলমানকে গীর্জায় বা মন্দিরে, বৌদ্ধ ভিক্ষুককে মসজিদে কিংবা হিন্দু ব্রাহ্মণ বা ধর্মগুরুকে অন্য ধর্মের উপসনালয়ে গমনে বাধ্য করা যায় না বরং তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্ভবও না। অথচ মাইজভান্ডার দরবার শরীফে অবাধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান বা উপজাতি গোষ্ঠী মহাতীর্থস’ান রুপে গণ্য করে স্ব স্ব ধর্মের স্বকীয়তা বজায রেখে মহান গাউছুল আজমের দরবারে সর্বপ্রকার উদ্দেশ্যে হাছিলের জন্য হাজিরা দিয়ে আসছেন শতাধিক বছর ধরে। কথিত আছে একদা ফটিকছড়ির শুয়াবিল এলাকার এক চাষা তার পেপে বাবাজান কেবলার জন্য নিয়ে যাবেন। কথামত বসনে-র এক দুপুর চাষা ২/৩টি বড় আকারের পেপে ঝুড়িতে করে বাবাজান কেবলার দরবারে আনার পথে গুরুদাস নামক বাবাজানের ভক্ত (এক হিন্দু সন্নাসী) ঐ চাাষার ঝুড়িতে থাকা পেপের একটি তাকে দিতে ধমক দেন। তারপর বাবাজানের দরবারে পেপে নিয়ে চাষাকে হাজির দেখে মুচকি হেসে বাবাজান চাষাকে বললেন-তুমি আমার গুরুদাস পাগলকে একটি পেপে দিয়ে আসতে পারতে। সেতো দুটো পেপের ফলই খেয়ে ফেলেছে। তুমি পেপে কেটে দেখ ভেতরের শাস সে খেয়ে ফেলেছে। যথারীতি পেপে কাটারপর দেখা গেল চামড়া বাইরে অবিকল আছে অথচ ভেতরের পাকা অংশ নেই। ঐ ঘটনার পর গুরুদাস পাগলা, গুরুদাস ফীকর নামে পরিচিতি লাভ করেন। সুক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় মাইজভান্ডার দরবার শরীফ অসামপ্রদায়িক ঐক্যের এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে ধর্ম সাম্যের বক্তব্য নিয়ে আধ্যাত্মিক পরিমন্ডলে মানবতার জয়গান এ মুখরিত হিন্দু, মুসলিম বৌদ্ধ, খৃষ্টান সকল জাতির জন্য এক অপূর্ব মিলন কেন্দ্র। বিগত শতাধিক বছর ধরে এ দরবার শরীফ রীতিমতো এক সমন্বয় ধর্মী ঐতিহ্যের সৃষ্টি করেছে। এ দরবারের দুই মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের শানে বা মাহাত্মে বর্ণনায় রচিত কয়েক সহস্র মাইজভান্ডারী গানের শিল্পী ও গীতিকারগন নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যেই সমপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও শানি-পূর্ণ সহাবস’ানের মাধ্যমে সঙ্গীত সাধনা করেছেন। তাদের মধ্যে মাওলানা আবদুল গণি কাঞ্চনপুরী, মাওলানা আবদুল হাদী, করিম বক্স, কবিয়াল রমেশ শীল, মনমোহন দত্তের নাম উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ জাল্লাশানুহু সুরা আনামের ১৬২ নং আয়াতে কারিমায় ঘোষনা দিয়েছেন “বল নিশ্চয় আমার প্রার্থনা, আমার উৎসর্গ ও আমার যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।পবিত্র কুরআন এর অন্যত্র বলা হয়েছে-“যারা বিশ্বাস করে, যারা ইহুদী এবং খৃষ্টান ও সাবিঈন, যারাই আল্লাহ ও শেষ দিবসে (কেয়ামত) বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে তাদের জন্য পুরস্কার, তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে। তাদের কোন ভয় নেই, এবং তারা দুঃকিত ও হবে না। ” হযরত শায়েখে আকবর ইবনুল আরবীর (১১৬৫-১২৪০ খঃ) এর মতে “প্রেমই যাবতীয় ইবাদতের ভিত্তি”। মৌলানা জালালুদ্দীন রুমী (রঃ)র মত হল “সমস- সৃষ্টির মূলে রয়েছে প্রেম। প্রেমের রাজা সকলকে স্বাগতম জানাচ্ছে। “প্রেম সমপ্রদায় দুনিয়ার সমস- সমপ্রদায় হতে ভিন্ন।” যারা আল্লাহর প্রেমিক তাদের জন্য একমাত্র আল্লাহ-ই তাদের সমপ্রদায় এবং আল্লাহ-ই তাদের ধর্ম” এখানে হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ খৃষ্টানের কোন ভেদাভেদ নেই কোন আপন পর পার্থক্য জ্ঞান নেই। মাইজভান্ডার দরবার শরীফে সব ধর্মের বিচার সাম্যের মরমী সূর শতাব্দীর অধিক সময আল্লাহর সৃষ্টি জগতের জন্য প্রবাহমান রয়েছে এবং কিয়ামত অবধি এ সিলসিলার ধারক ও বাহকগনের মাধ্যমে চলমান থাকবে। এ কথা সহজেই অনুমেয়। সর্বোপরি, এ দরবার শরীফের খলীফাবৃন্দ ও খেলাফত প্রাপ্ত আওলাদগণের ভেতর দিয়ে অর্গল মুক্ত ঐশী প্রেমের বাণী বিশ্বব্যাপী বিস-ার লাভ করেছে।
পরিশেষে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মাইজভান্ডারীয়া ত্বরিকায় ধর্ম-সাম্য ও অর্গলমুক্ত ঐশী প্রেমবাদের ঘোষণার মধ্যে মূর্ত ঐক্যের অসামপ্রদায়িক বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অতি সুন্দর ও সাবলীল জীবন ঘনিষ্ঠভাবে। যে কারণে এ দরবারের যুগল গাউছুল আজমের জীবদ্দশায় মুসলমান শিষ্যের পাশাপাশি হিন্দু বৌদ্ধ, খৃষ্টান স্ব-স্ব ধর্ম কাঠামোর মধ্যে থেকে এ ত্বরীকা ও ধর্ম থেকে স্ব-স্ব আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য প্রয়োজনয়ি উপকরণ অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। যেমন-কবিয়াল রমেশ শীল গেয়ে উঠেছিলেন-“মাটির মূর্তির পূজা ছেড়ে মানুষ পূজা কর, সপ্তদ্বীপ, আঠার আলম মানুষের ভেতর। ছাড় আভিজাত্যের খেদ, মানুষে মানুষে নাই জাতের ভেদাভেদ, ঘুচিলে মানুষের প্রভেদ দেখবি গুরু তার ভেতর।” অন্যত্র লিখেছেন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ খৃষ্টান সকর ধর্মের এক কথা, নীতি রদ বদল মাত্র গন-ব্য স’ান দুটি কোথা?”

This entry was posted in Uncategorized, লেখনী সমূহ. Bookmark the permalink.

No Comments