নৈরাজ্য ইসলাম সমর্থন করে না- শাহ্ এস এম আক্তারুজ্জামান আল্-মাইজভান্ডারী

নৈরাজ্য ইসলাম সমর্থন করে না-
শাহ্ এস এম আক্তারুজ্জামান আল্-মাইজভান্ডারী

সকল গুনগান, স্তব আর প্রশংসাগীতি সবই মহান সৃষ্ঠিকর্তা আল্লাহর জন্য যিনি সর্বময় মতার প্রকৃত মালিক। যিনি জগতের সকল কল্যাণ আর নানন্দিক রূপ সৌন্দর্যের স্রষ্টা। তাঁর উদ্দেশ্যেই আমাদের সকল বন্দনা আর উপাসনা। তিনি আমাদেরকে শান্তি, সাম্য ও শৃংখলার ধর্ম ইসলামে বিশ্বাস ও আনুগত্যের যে তাওফীক দিয়েছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর একক হুকুমেই সবকিছুই পরিচালিত ও আবর্তিত হচ্ছে। তাঁর রাজত্বে একক প্রভুত্বে আর কেউই নেই। তিনি লা শরীক। তিনিই স্রষ্টা, রিজিকদাতা ও উপাস্য পালনকর্তা। পরিবার সদৃশ্য সৃষ্ট জগতকে তিনিই রা ও পালন করেন। আমাদের জীবন মৃত্যুর মালিক তিনিই। আল্লাহই তাঁর সৃষ্টির রনাবেন করেন। তাই কেউ মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি ভঙ্গ করলে তা হয় আল্লাহর কাছে গুরুতর অপরাধ, মহাপাপ। এমনকি তার সৃষ্টিতে কোন বিপর্যয় ঘটানোকে তিনি নরহত্যার চেয়েও জঘন্য ও গুরুতর পাপ বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন। ইরশাদ হয়েছে “আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করো তাদের সাথে যারা লড়াই করতে আসে তোমাদের সাথে। আর তোমরা সীমালংঘন করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না”(সুরা বাকারাঃ আয়াত -১৯০)। আবার একই সুরার ২১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে “—–আর গোলযোগ সৃষ্টি করা ত খুনোখুনির চাইতেও কঠিন গুনাহের কাজ ”।
মানুষকে কষ্ট দেয়া, ত্রাস সৃষ্টি করা, জানমালের তিসাধন করা, বিপর্যয় ও ফাসাদ সৃষ্টি করা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রক্তপাত করা, মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘিœত করা শুধু প্রচলিত আইনেই অপরাধ নয়, বরং ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে তা নরহত্যা থেকেও জঘন্যতর অপরাধ। আর ইসলাম রার নামে এ ধরনের অনৈসলামিক কর্মকান্ড চালানো হলে তা হবে ইসলামকে কলঙ্কিত করার মত আরো একটি অমার্জনীয় অপরাধ। পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। ইরশাদ হচ্ছে, “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি। যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার নর-নারীকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে”। (৩৩ঃ৫৭-৫৮)
ইসলামের স্বার্থ রার নাম দিয়ে যারা মানুষের উপর চড়াও হয়, লাঠিসোটা নিয়ে নিরীহ পথচারীর উপর হিংস্র হায়েনার মত ঝাপিয়ে পড়ে, নিরপরাধ মানুষের সম্পদ বিনষ্ট করে, গাড়ি ভাংচুর করে, আগুন লাগায়; তারা ইসলামের বন্ধু হতে পারে না বরং শান্তির ধর্ম ইসলামকে তার শত্র“দের চোখেও হেয় ও ঘৃণ্য প্রতিপন্নকারী।
রাসুলে পাক (দঃ) ইরশাদ করেন, “কেবল সে-ই মুসলমান, যার হাত ও মুখের অনিষ্টতা থেকে অন্য মুসলমানগণ নিরাপদ থাকে; কেউই কষ্ট না পায়। আর কেবল সে-ই মুমিন যার কাছ থেকে মানুষ তাদের রক্ত ও ধনসম্পদের বিয়য়ে নিরুদ্বেগ থাকে”। (মাযহারীর বরাতে তাফসীরে মা-আরেফুল কুরআন)
যারা মনে করে থাকে ইসলামের নাম দিয়ে করলে সব রকম নৈরাজ্য লুটপাট বা জিহাদ বৈধ, তাদের মনে রাখা উচিত, মুসলমান আক্রান্ত না হলে অস্ত্র ধারণ করাও হারাম। প্রিয় নবীর ইরশাদ, “যে অন্যায় ভাবে কারও প্রতি অস্ত্র প্রয়োগ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়”। হাজীদের জন্য আসওয়াদ চুম্বন করা অতীব পূণ্যময় কাজ। কিন্তু হজ্বের মাসআলায় স্পষ্ট আছে যে, কোন মুসলমানকে কষ্ট দিয়ে সেই আসওয়াদকে চুমো দেওয়া গুণাহ। প্রয়োজনে ইস্তলাম বা ইশারায় বিকল্প চুমো দেবে, আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর মেহমানদের কষ্ট দিয়ে করা সে পূণ্য আল্লাহর কাছে প্রহণযোগ্য নয়। বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে রয়েছে, “কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম অবস্থানে থাকবে সেই ব্যক্তি, যার তির আশংকায় সাধারণ মানুষ তার থেকে দুরে থাকে”। ইয়াজীদ মসনদকে কষ্টকমুক্ত করার হীন উদ্দেশ্যে ইমাম হুসাইন ও আহলে বাইতের প্রতি অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছেন যা ইয়াজীদিদের কাছে বৈধ। পান্তরে ইমাম হুসাইন (রাঃ) নিজ অনুসারীদের উদ্দেশ্যে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন যে, যতণ পর্যন্ত শত্র“রা তাদের দিকে তীর না ছোঁড়ে ততণ পর্যন্ত তারা যেন কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধের সূচনা না করেন। প্রিয় নবী ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কোন মুমিন ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেই কষ্ট দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি আমাকে কষ্ট দেয় সে তো আল্লাহকেই কষ্ট দিল”।
পৃথিবীতে অনর্থ, বিপর্যয় সৃষ্টি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা করাও ইসলাম সম্মত নয়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, “আর এমন কিছু লোক রয়েছে, যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা আপনাকে চমৎকৃত করবে। আর নিজের মনের মাঝে যা আছে তাতে আল্লাহকে স্ব্যা উপস্থাপন করে। প্রকৃতপে তারা কঠিন ঝগড়াটে। যখন তারা ফিরে যায় তখন পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে। আর শস্যত্রে ও প্রজম্মের বিনাশ সাধন করতে সচেষ্ট হয়। আল্লাহ তাআলা ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না”। (২:২০৪-২০৫) তিনি আরো ইরশাদ করেন, “পৃথিবীতে সংস্কার সাধনের পর তোমরা তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না”। (৭:৫৬) এতে পৃথিবীর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার সংস্কারের কথাই বলা হয়েছে। বাহ্যিক সংস্কার, যেমন-একে চাষাবাদ, চলাফেরা ও বসবাসের উপযোগী করা যাতে উৎপাদন ও উৎপন্ন সামগ্রী মানুষের কল্যাণে আসে। এর ব্যত্যয় ঘটানোই বিপর্যয় ও অনর্থ সৃষ্টি করা, যা হারাম। আর এর অভ্যন্তরীণ সংস্কার যেমন-নবী রাসুল ও হেদায়তের গ্রন্থ দিয়ে এটাকে কফুর, শির্ক ও মানবতা বিপর্যয় অন্যায় থেকে মুক্ত করে মানুষের শুদ্ধবুদ্ধির উদয় ঘটায়। এটার পরিপন্থীতাই ফাসাদ।
রাজনৈতিক দলমতের অন্তর্ভূক্ত না হলেই অনেকে প্রতিপকে কাফির মুশরিক সাব্যস্ত করে তাদের মালসম্পদ লুটে নেয়া, তাদেরকে হত্যা করাও পূণ্য মনে করে এরকম কিছ ধর্ম ব্যবসায়ী। একাত্তরে হিন্দুদের মাল সম্পদ ও সম্ভ্রম লুট করে আতœপ্রসাদ লাভ করেছিল এ ধরনের কিছু কুলংগার। অথচ আল্লাহর রাসুলের ফরমান, “মনে রেখো, যদি কোন মুসলমান কোন অমুসলিমের উপর নিপীড়ন চালায় বা তার অধিকার খর্ব করে, বা তাকে সাধ্যের অতিরিক্ত কাজে বাধ্য করে বা জবরদস্তি কিছু কেড়ে নেয়, তবে হাশরের দিন আমিই তার বিরুদ্ধে বাদী হয়ে আল্লাহর কাছে নালিশ করবো”। (আবু দাউদ)
সুতরাং আল্লাহর রাজ্যে কাহারোই আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের আদেশ নিষেধকে অমান্য করার সুযোগ নেই।আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর পথে চলার তৌফিক দান করুন।

This entry was posted in Uncategorized, লেখনী সমূহ and tagged . Bookmark the permalink.

No Comments